You are here: Home / অনুভূতি / মায়ের জন্য কান্না

মায়ের জন্য কান্না

Cry for Mother (Niloy)প্রত্যেক মানুষের কোন না কোন কষ্ট থাকে। তবে আমার কষ্ট একটু ভিন্ন। আমার জীবন সব সময় অম্লান বেদনায় ভরপুর। আর জীবনে সব সময় কষ্ট থেকে যাবে। এ কষ্টের আর শেষ হবে না। কষ্ট সব সময় আমার পিছু হাটবে। প্রিয়জন হারানোর কত বেদনা, দুঃখ, কান্না, বেদনার তা এখন আমি বুঝি। প্রিয়জন হারালে মনে হয় পৃথিবীর সব কিছু হারিয়েছি। প্রিয়জনের মধ্যে সবচেয়ে কাছের মানুষ হচ্ছে মা। প্রিয় মাকে যদি কেউ হারায় তাহলে মনে হয় পৃথিবীর সব কিছু হারালো। সে যদি তার মাকে খুব ভালবাসে। মায়ের কাছ থেকে আমরা সব পেয়েছি। পৃথিবীর এমন কোন জিনিস নেই যে, আমরা পাইনি।
এবার একটু আমার কথা বলি। আমি আমার বাবাকে ৮ মাসের সময় হারিয়েছি। মনে হয় তাকে দেখিনি। বাবা কী জিনিস তা বুঝতে পারিনি। আমার মুখের সবকিছু উচ্চারিত হলেও বাবা নামটি উচ্চারিত হয় না। কারণ ছোটবেলা থেকেই বাবা নামটি উচ্চারিত হয়নি। একটা শিশুর জন্মের পর ৮ থেকে ৯ মাসের সময় আধো আধো বুলিতে দাদা, বাবা, মা উচ্চারিত হয়। কিন্তু আমার সেটা সম্ভব হয়নি। কিন্তু আমি আমার মায়ের কাছ থেকে সবকিছু পেয়েছি। শিশুকালে দেখি বাবা-মা শিশুর মেধা বিকাশের জন্য ভাল খাবার ও আনন্দের জন্যর খেলনা কিনে দিতো। আর আমার খেলনা তো দূরের কথা মুখে ঠিকমত বার্লি, আটা, সুজি খাওয়াতেও পারত না। কারণ বাবার মৃত্যুর পর আমরা ওই সময় খুব অসহায় ছিলাম। খাবারও ঠিকমত জুটতো না। এ বিষয়গুলো দেখলে বোঝা যায় আমার জীবন কত কষ্ট আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত ছিল। মা শত কষ্টের মাঝে সবকিছু আগলে রেখে দুঃসময় পাড়ি দিতে লাগলেন। কষ্টের কষাঘাত দেখতে দেখতে অনেকটা বছর চলে গেল। কষ্টের মধ্য দিয়ে লেখাপড়া করলাম। এরপর ভাল একটা সময় আসতে লাগল। যে সময় মা একটু শান্তি পাবে। আমি লেখাপড়ার জন্য দূরে থাকতাম। তখন মা দিনে ৩ থেকে ৪ বার ফোন দিতো এবং বলতো বাবা তুমি কি করো? তুমি ভাত খেয়েছ, তোমার শরীর ভাল আছে? বাড়িতে গেলে যে খাবার আমার পছন্দের ছিল সে খাবারগুলোর আয়োজন করত। বাড়ি গেলে সব সময় হাসি খুশিতে রাখত। রাতে তার কাছে ঘুমাতাম এবং সারারাত পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতো। মানুষকে উপকার করার জন্য নানা উপদেশ দিত।
সবকিছু বিবেচনা করে দিনগুলো ভালভাবে চলছিল। কিন্তু এই সুখ ঈশ্বর সইতে পারেনি। ঈশ্বর তাকে ক্যান্সার রোগ দিয়ে বসল। কি ক্ষতি করেছিলাম ঈশ্বরের? আমরা তাকে মন ভরে ডাকতাম। ঠিকমত প্রার্থনা করতাম। মুহুর্তের মধ্যেই সবকিছু তছনছ হয়ে গেল আমাদের পরিবারের। প্রস্তুত হয়ে গেলাম এতিম হয়ে যাওয়ার জন্য। ঈশ্বর এমনভাবেই রুদ্র হলেন যে, কোন ডাক্তার, কবিরাজ, হাকিম কিংবা কোন সাধুর চেষ্টায় কোন কাজ হলো না। সব মিলিয়ে আমার জীবন অভিশপ্ত জীবনে পরিণত হল। আমি প্রায়ই মানুষের সেবা করার চেষ্টা করি। এক অনুষ্ঠানে অসহায়দের শাড়ি দিতে গেলে তখন মা একজন লোকের কথা বলে যে, বাবা ওকে একটা শাড়ি দিও। শাড়ি দিয়ে আসলে মা বলে তুমি বাবা আরো শাড়ি দিতে পারবা। ওই সময় মায়ের শারীরিক শক্তি এতই দুর্বল যে, ঠিকমত কথা বলতে পারত না এবং নাড়চড়া করতে পারত না। ওই সময় মা ক্ষীণ কণ্ঠে বলে, আমার কাছে একটু আয় এবং হাতটা তোর পেটের উপর রাখ। পেটে হাত রাখলে মা বলে, তুই সারাদিন কিছু খাস নাই। তখন আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি। কারণ মা চলে গেলে এ রকম কথা আর কেউ বলবে না। এটাই ছিল আমার মায়ের সাথে শেষ কথা। আমি ওই দিনের কথা কোনদিন ভুলতে পারব না। এর তিন দিন পর রাত ১১টা ১৫ মিনিটের সময় আমার মা শোয়া এবং তার বাঁ পাশে বসে কান্না করছি, ঠিক ওই সময়ই মায়ের আত্মা দেহ ছেড়ে চলে যায়। ওই মুহুর্তগুলো আমার জীবনের চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তখন থেকে আমার নতুন নামকরণ হলো এতিম ছেলে। আমি এতিম হয়ে গেলাম সারা জীবনের জন্য। আর এটাই ঠিক। এই বয়সে কয়জন এতিম হতে পারে। এতিম হতে ভাগ্য দরকার। ঈশ্বর হয়তো আমাকে সেই ভাগ্যই দিয়েছে! আমি এখনও লেখাপড়ার জন্য দূরে থাকি। কেউ ফোন দিয়ে বলে না, তুমি ভাত খাইছ? তুমি কি করো? তুমি বাড়ি আসবা কবে? পছন্দের খাবার আর কেই আয়োজন করবে না। কেউ ওই রকম হবে না। এই মধুময় সুন্দর দিনগুলো আর আসবে না। মা, তুমি চলে গেছো। কিন্তু তুমি যে, সুন্দর, মধুময় দিনগুলো রেখে গেছ সেই দিনগুলো কখনো ভুলতে পারব না। সারাজীবন ওই দিনগুলো ধরে রাখতে হবে এবং তোমার কথা মনে পড়বে। মা তুমিতো চলে গেছ। যাওয়ার পর আমার যে কি অবস্থা, কি কষ্ট তা বলে বোঝাতে পারব না।
মা জানো, এতিম হবার যে কত যন্ত্রণা তা আগে বুঝতে পারিনি, এখন বুঝি। সবশেষে ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা, কেউ যেন আমার মত এই বয়সে এসে এতিম না হয়। যদি হয় তাহলে তার জীবনে কষ্টের সীমা থাকবে না। আর পৃথিবীর সকল মানুষের উদ্দেশ্য আমার দাবী, কেউ যেন মা-বাবাকে কষ্ট না দেন। মা-বাবা যখন চলে যাবে তখন বুঝবে মা-বাবা হারানো কত যন্ত্রণা। তখন আমার মত সারাজীবন কাঁদতে হবে।

Niloyঅনুভূতি লেখক: নির্মল মন্ডল নিলয়, প্যারালিগাল কর্মী, মাদারীপুর লিগাল এইড।
(প্রকাশকাল: ১ নভেম্বর ২০১৩ইং,পরিমার্জন: ১১ নভেম্বও ২০১৪ইং)
যোগাযোগ: মাদারীপুর লিগাল এইড এসোসিয়েশন, মোবাইল: ০১৭৪৬৪১৪৪৭০


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top