You are here: Home / অনুভূতি / পরস্ত্রী

পরস্ত্রী

Graphics Zahir from Suma Cotton Workএকশতে স্পিড মিটারে কাটাটা স্থির হয়ে আছে অনেকক্ষণ। সব জানালা বন্ধ। সবে কেনা নতুন গাড়ি শব্দহীন চমৎকার মসৃণ রাস্তা। কপুনি নেই, হাজারো গাড়ির সঙ্গে আমরা চলছি ফ্রি-ওয়ে দিয়ে। আশে-পাশে পরিচ্ছন্ন দৃশ্য।
মেলবোর্ন পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর শহর। এমনেতেই দেরি হয়ে গেছে। মালয়শিয়ান এয়ারলাইন্সের প্লেনটি বোধ হয় মিস করতে যাচ্ছি। ড্রাইভারের সিটে আমার স্ত্রী। পেছনে আমার দুই সন্তান।
সত্তর শতকে কোন একদিন কৈশোরের খেলার ছলে আমার স্ত্রীকে তার দশ বারো বছর বয়সে কথা দিয়েছিলাম, একদিন নতুন লাল টুকটুকে গাড়ি কিনে দেবো। প্রায় তিন যুগ পরে এইতো সেদিন পুরনো দুটির গাড়ির পরে তৃতীয় গাড়িটি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী লাল রঙের কিনতে গিয়ে কিনলাম কালো রঙয়ের, দুই সন্তানের দাবির মুখে।
গাড়ি থেমে যাওয়ার কারণে বুঝলাম আমারা এখন মেলবোর্ন এয়ারপোর্টে। ট্রলিতে সুটকেস চাপিয়ে স্ত্রী ও ছেলেদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম।
বোর্ডিং কার্ডের জন্য লাইনে দাড়িয়ে আছি। আমরা বাকি মাত্র কয়েকজন।
এক ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি ঢাকা যাচ্ছেন?
লক্ষ্য করলাম, সঙ্গে তার বিবাহিত স্ত্রী। চমৎকার কাজ করা সেলোয়ার কামিজ পরা।
তিনি বললেন, আমার স্ত্রী একা। ওনাকে ঢাকা যাওয়ার ব্যাপারে একটু সাহায্য করবেন।
কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম এবং তার স্ত্রীকে নিয়ে কাউন্টারে গেলাম।
টিকেট, পাসপোর্ট দেখিয়ে বোর্ডিং নিয়ে ইমিগ্রেশন পার হয়ে যখন প্লেনের গেটে আসি তখন আমরাই বোধে হয় শেষ যাত্রী।
প্লেনে ঢোকার মুহূর্তেই বিনয়ের সঙ্গে হাসি দিয়ে যখন এয়ারহোষ্টেস দুজনকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানালো তখন লজ্জায় মাথা নত হয়ে গেল। ঘামতে থাকি প্লেনের এয়ারকন্ডিশন্ড ক্যাবিনে।
তাকাতে পারছিলাম না তার দিকে।
পাশাপাশি সিটে বসলাম। আমার ঘটনাবহুল জীবনে লজ্জা মাখানো অথচ মধুর পরিস্থিতি আর হয়নি এমন। একরাত দুই দিন কিভাবে কাটাবো পরন্ত্রীর সঙ্গে? এটা প্রায় অসম্ভব। প্রতি ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা করা, আমরা যে স্বামী-স্ত্রী নই। এসব ভাবতে ভাবতে বিশাল প্লেন চলতে শুরু করলো।
রানওয়ে ছেড়ে আকাশে ওড়ার মুহূর্তে তার সঙ্গে আমার প্রথম স্পর্শ। তার শরীর থেকে সুন্দর পারফিউমের গন্ধ আমার চিন্তার জগতে অনেকখানি অংশে জড়িয়ে গেল। সুন্দরী এয়ারহোষ্টেসের হাসি, কখনো সিটবেল্ট বাধা, পত্রিকা, কম্বল, খাবার, লিকিওর ইত্যাদি নিয়ে সারাটা পথে দুজনকেই অস্বস্তিকর পরিস্তিতিতে পড়তে হলো বার বার।
কতো দিন কতো রাত অষ্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড ও অন্যান্য দেশে নাইট ক্লাব, সি-বিচ এবং হোটেলে কাটিয়েছি কখনো প্রিয় স্ত্রীকে নিয়ে, কখনো বা একা। উলঙ্গ-অর্ধউলঙ্গ, কাচা ফুলের মালা পরা, নাচের ছন্দের সঙ্গে মেলানো শরীর, আমাকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি স্ত্রীর বিশ্বাস থেকে। ভাবি আমার স্ত্রীর কথা। আমার উদার মনের স্ত্রী সব সময় বলতেন, ‘ইউ ক্যান লুক বাট ডোন্ট টাচ। তুমি দেখতে পারো, কিন্তু ছোবে না।’
আমি যেন এক মহাযুদ্ধে জড়িয়ে গেছি আজ। মেঘের অনেক উপরে চলার পথে ওয়াইন নিলাম। তার জন্য কমলার রসের অর্ডর দিয়ে নিজের জন্য ফেঞ্চ রেড ওয়াইন নিই। তিনি কি মনে করবেন তা নিয়ে ভাবি না। ছোট-খাটো কথায় জানতে পারি ঢাকায় থাকেন, মাস খানেক হলো বিয়ে হয়েছে, ভিসার শর্ত অনুযায়ী সাত দিনের জন্য অস্ট্রেলিয়া এসেছিলেন স্বামীর সঙ্গে। একা ফিরছেন।
সত্যি কথা বলতে কি, পাশাপাশি হেটেছি, বসেছি, কথা বলেছি তবুও ভালো করে মুখটা দেখা হয়নি তখনো। প্লেন তখন প্রায় চল্লিশ হাজার ফিট উপরে। মেঘের ছায়া পড়েছে নিচে সমুদ্রের নীল পানির ওপর। সেই সঙ্গে আমার মনের ওপর তার ছায়া।
চিন্তাহীন তিনি খুবই স্বাভাবিক বুঝলাম তখনই, যখন জীবনের প্রথম এলকোহল স্বাদের জন্য অনুরোধ জানালেন। আমার দুশ্চিন্তা বাড়লেও এলকোহল কারণে আমার অনুভূতির তীব্রতা কম। গ্লাসে ঠোটের ছোয়া দিতে দিতে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে কখন যে কুয়ালালামপুর এসে গেছি তা বুঝতেও পারিনি। লেফট লাগেজে (এয়াপোর্টে সাময়িকভাবে সুটকেস ও অন্যান্য জিনিসপত্র রাখার স্থান) ব্যাগ ও সুটকেস রেখে ট্যাকসি ধরলাম এয়ারলাইন্সের দেয়া ফাইভ স্টার হোটেলের উদ্দেশ্যে। দুই টিকেটে দুটো রুম বরাদ্দ থাকা স্বত্ত্বেও হোটেল রিসেপশন থেকে আমাদের অনুরোধ (ব্যবসায়িক স্বার্থে) করা হলো একই রুমে থাকার জন্য।
তাকাই তার দিকে। তিনি স্বাভাবিক।
কথা না বাড়িয়ে চাবি নিয়ে লিফটের দিকে এগোলাম রাত কাটানোর জন্য।
চমৎকার সাজানো রুম, কুইন সাইজ বেড, ছোট্ট বার ও ঝকঝকে রুম। ভারী পর্দা সরাতেই সন্ধ্যার আলোতে দেখা গেল শহরের একটা অংশ। ক্ষিধে নেই তেমন। শাওয়ারে যাওয়ার ইচ্ছা আমার। তিনি বসে আছেন সোফায়। তার অনুমতি নিয়ে আমি বাথরুমে। পুরো বাথটাবে পানি ছেড়ে ডুবে আছি মুখ তুলে। শরীরের প্রচণ্ড একটা ভালো লাগা, অস্থির মনটাকে বাধার চেষ্টায় বুদ হয়ে থাকি। আমার স্ত্রী, সন্তান, ভালোবাসার মানুষগুলোকে মনের মাঝে এনে নাড়াচাড়া করে ভুলে থাকতে চাই পরস্ত্রীকে।
হঠাৎ দরজার খোলার ছোট্ট একটা শব্দ আমার চিন্তার অবসান ঘটায়। তিনি অনুমতি চান ভেতরে আসার।
আমার নগ্ন দেহটাকে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে পাশ ফিরি দেয়ালের দিকে। অনুভব করলাম তার উপস্থিতি। শ্রুতিমধুর শব্দের পর কয়েক মুহুর্তের নীরবতা। কমোডের ফ্লাশের শব্দে পাগল হয়ে যাই। ধর্মহীন বিধাতাকে ডাকি। ঠাণ্ডা পানির কল ছেড়ে শরীর আর মনের তাপ শূন্যতে আনার ব্যর্থ চেষ্টা করি।
কতক্ষণ জানি না সময় গেল। হঠাৎ দরজায় তার কণ্ঠ, তাড়াতাড়ি শেষ করুন, কফি খাবো।
কিছুক্ষণ পর আমার রাতের পোষাক মিষ্টি হলুদ শর্টস আর ভি কালারের শাদা বর্ডারের নীল টি-শার্ট পরে যখন বের হলোম, শরীরটা ভালো লাগছিল। মাথা নিচু করে বললাম, মুখ হাত ধুয়ে আসুন।
এরই মাঝে রুম সার্ভিস কফি ও হালকা খাবার রেখে গেছে। চুপচাপভাবে সময় নিয়ে দুজনে কফি শেষ করলাম। টিভি অন করে পত্রিকা হাতে নিয়ে বললাম, ঘুম এলে বলবেন।
ঘুম আসছে। কিন্তু ঘুমের কাপড় নেই। উত্তরে তিনি জানালেন।
কিভাবে সাহায্য করতে পারি? আমার প্রশ্ন।
দিন আপনার ব্যাগটা, দেখি কি পাওয়া যায়।
উজ্জ্বল শাদা রঙের এক পায়ে নীল বর্ডার দেয়া আমার স্ত্রীর কেনা নাইকি-র শর্টসটা হাতে নিয়ে আমার মুখের সামনে তিনি তুলে ধরলেন।
আমি বাকরুদ্ধ।
বাথরুম থেকে বের হলেন যখন, আমি অভিভূত। হৃদপিণ্ডের মাঝে ঢোলের বড় বড় আওয়াজ। বাঙালি বৌ। তার সাহস, শক্তি ও সৌন্দর্য আমাকে অভিভূত করে। সুন্দর শরীরের বাকে শাদা নাইকি-র শর্টস আর টকটকে লাল ব্রা-য় শেষ বিকেলে গভীর সমুদ্রে ডুবে যাওয়া সূর্যের আলোর ছটা ভেসে ওঠে আমার চোখে। তলিয়ে যেতে থাকি রঙের মাঝে। চোখ বন্ধ করি।
হাতে আমার ঠান্ডা অস্ট্রেলিয়ার ফস্টার বিয়ারের ক্যান। দীর্ঘ চুমুক আমার তাপ কমাতে পারে না।
পা ঝুলিয়ে বেডে বসে আমার দিকে তিনি তাকিয়ে আছেন। কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। সারা শরীরে রক্ত প্রবাহ দ্বিগুণ হওয়াতে শরীরের কিছু অঙ্গে চাপ অনুভব করতে থাকি। সুযোগ নেয়ার অভিযোগ করেনি কেউ কোনদিন। আজকেও হারাতে চাই না। শরীরকে মনের খাচায় রাখার জন্য মিনিবার থেকে ব্র্যান্ডি গলায় ঢালি।
শুয়ে পড়ুন। বলে বালিশ নিয়ে সোফায় বসি।
চোখে তার প্রশ্ন, আমি কেমন মানুষ?
প্রমাণ দিতে চাইনি আমি যে পুরুষ। সোফায় শোয়া নিয়ে ঝগড়া না বাড়িয়ে বাধ্য হয়ে শুতে হলো কুইন বেডের এক কর্নারে।
সকাল হতে আরো প্রায় সাত ঘন্টা বাকি। তার শরীরের গন্ধ, নিঃশ্বাসের শব্দে ঘামতে থাকি ঠাণ্ডা ঘরে। রুমে আরো ঠাণ্ডা বাড়াতে গেলে আপত্তি তুলে বললেন, আমি খালি গায়ে।
ঘুমাইনি সে রাতে।
ওই রাত আমার জীবনের ব্যর্থতার রাত।

উঠুন, আমার গোসল শেষ, বাথরুম খালি। আটটায় কুয়ালালামপুর-ব্যাংকক ফ্লাইট ধরতে হবে।
পরাজিত সৈনিকের মতো বাথরুমে ঢুকে শত চেষ্টাতেই রাতের ব্যর্থতা ধুতে পারলাম না। বাথরুম থেকে বেরুতেই আমার কপালে গভীর চুমু একে বললেন, আপনাকে মনে থাকবে, ক্ষমা করবেন।
আমি তাকিয়ে থাকি তার দিকে।
আমি যে হেরে গেলাম…।

Sajjad Hossen Batchu Howladerঅনুভূতি লেখক: এস হোসাইন, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া থেকে।
যোগাযোগ: মেলবোর্ন প্লাজা, মাদারীপুর।
রচনাকাল: ২০০৫ইং, প্রথম প্রকাশ: যায় যায় দিন, ১৮-১০-২০০৫ইং।
shossain005@yahoo.com


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top