You are here: Home / অনুভূতি / ‘অনুভূতি’ : সাহিত্যের নতুন ধারা বা শাখা

‘অনুভূতি’ : সাহিত্যের নতুন ধারা বা শাখা

সাহিত্যে তুলে ধরা হয় মানুষের কথা, মানব জীবনের কথা। ছড়া লিখতে হলে ছন্দ থাকতে হবে; কবিতা লিখতে প্রচলিত একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে লিখতে হবে; গল্প লিখতে গল্পের প্লট এবং পূর্বাপর ঘটনা তুলে ধরে একটি পরিণতি থাকে; উপন্যাসে থাকতে হবে ব্যক্তি ও সমাজ সমন্বয়ে একটি সময়ে মানুষের সামগ্রিক জীবনচিত্র; প্রবন্ধ লিখতে প্রকষ্টরূপে একটি বিষয়কে যুক্তি-তর্ক-উদাহরণের আলোকে তুলে ধরতে হবে-আমরা সাধারণভাবে এমনটিই জেনেছি।
onuvutiসাহিত্যের প্রচলিত এই সব ক্ষেত্রে সাথে আমাদের যাদের বিচরণ নেই, তারা কি করবে? অথচ আমরা অনেকেই চাই আমাদের জীবনের ঘটনাগুলো মানুষকে জানাতে। মানুষের আশা-আকাঙ্খা, আবেগ-ভালবাসা, চিন্তা-চেতনার কথা, ভালা লাগা কিংবা মন্দ লাগার কথা; মানুষের জীবনের বিভিন্ন দিক দেখে তা লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করতে চাই।
গল্প, কবিতা, ছড়া, উপন্যাস, গীতি-কবিতা, নাটক, গীতিনাট্য, প্রবন্ধসহ প্রচলিত সাহিত্যের মধ্যে আরও যেসব ধারা বা শাখা আছে তার মধ্যে যেমন ‘মহাকাব্য’ আছে, তেমনি ‘অনুগল্প’ও আছে। আবার ইংরেজিতে সনেট (বাংলায় চতুদর্শপদী)ও সাহিত্যের একটি ধারা। কবিতার শব্দ ও লাইনের মধ্যে মিল রেখে এবং দু’টি অংশের একটি ভাবের বিস্তার ও অপরটিতে পরিণতির কথা তুলে ধরে এই ধারাটি জনপ্রিয় হয় ‘সনেট’ নামে। গল্প বলতে বড়গল্প কিংবা ছোটগল্প-এর পাশাপাশি ‘অনুগল্প’ও বহুল জনপ্রিয় ও প্রচলিত। এমনকি ছন্দবদ্ধ ৪ লাইনের সংক্ষিপ্ত আকৃতি-প্রকৃতিতে ‘অনুকাব্য’ নামেও সাহিত্যের একটি নতুন ধারাও সৃষ্টি বা প্রচলন করেছেন দন্তস্য রওশন (সাইদুজ্জামান রওশন, যিনি দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় কর্মরত) নামের এক সাহিত্যকর্মী। এই ধারাটি জনপ্রিয়ও হয়েছে।
এক সময় ছন্দবদ্ধ না হলে তাকে কবিতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো না। এখন মুক্তছন্দেও কবিতা লেখা হয়। আমাদের লেখকদের মধ্যে দু’একজন আবার এই ধরণের লেখাকে ‘মুক্তগদ্য’ হিসেবে অভিহিত করতে চেয়েছেন। আমারা গুনে গুনে একশ’জন সাহিত্যকর্মীর সাথে কথা বলেছি, তার মধ্যে আটানব্বই জনই ‘অনুভূতি’ প্রত্যয়টি পছন্দ করেছেন। এরপরও যদি কারো কোন সুস্পষ্ট মতামত বা প্রস্তাব থাকে তবে তা-ও আমরা গ্রহণ করব।
আমরা এই সংখ্যার সকল লেখক নিজেদের মধ্যে এবং অপরের সাথেও আলোচনা করেছি অনেকবার। আমরা সাধারণ ভাষায় আমাদের মনের কথা বা জীবনের কোন একটি ঘটনা বা অনুভবের কথা সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরার এই ধারাটির নাম নির্ধারণ করার বিষয়েও আলোচনা করেছি। আমরা যে ধরণের কাঠামোতে লেখার কথা বলেছি বা এই সংখ্যায় প্রকাশিত লেখাগুলোতে তুলে ধরেছি, তা বিক্ষিপ্তভাবে অনেকেই লিখেছেন বা লিখছেন। কিন্তু তা কোন নাম দিয়ে নয় যা সাহিত্যের শাখা হিসেবে চিহ্নিত বা বিবেচিত। এ সকল লেখা শুধুমাত্র লেখা হিসেবেই প্রকাশিত হয়েছে বা হচ্ছে পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন, ব্লগ বা দিনপঞ্জি ওয়েবসাইটে। বর্তমান সময়ের দৈনিক প্রথম আলো’র ছুটির দিনে, সমকাল পত্রিকার কালেরখেয়া’সহ বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও লিটল ম্যাগ ও পত্র-পত্রিকায় অনেকেই লিখছে আমরা যে ধরণের ধারা বা কাঠামোর কথা বলছি বা প্রচলন করতে আগ্রহী। লিখেছেন বা লিখছেন অনেকেই, আমরাও লিখছি। তবে আমাদের মূল দাবী তা ‘অনুভূতি’ নামে সাহিত্যের ধারা বা শাখা হিসেবে স্বীকৃতি। কারণ এই ধরণের লেখার মধ্যেও আছে সাহিত্যের অনেক উপদান।
যারা এই ধরণের লেখা লিখে থাকেন তারা সাহিত্যিক বা সাহিত্যকর্মী হিসেবে স্বীকৃতি পান না। আমরা চাই এই লেখার সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃতি, সাথে সাহিত্যিক বা লেখক হিসেবেও স্বীকৃতি।
মূল ধারার একটি উপন্যাস বা গল্প যদি হয় একটি বড় গাছ, তবে আমাদের প্রস্তাবিত সাহিত্যের এই শাখা ‘বনসাই’; একটি বড় আকৃতির বটগাছে যেমন গোড়া, কান্ড, ডাল-পালা, পাতা সবই আছে, তেমনি একটি বনসাই বটগাছেরও মূল, কান্ড, ডাল-পালা, পাতা, ফল সবই আছে। ভিন্নতা শুধু আকৃতিতে। আমাদের এই সাহিত্যের ধারাতেও ছোট পরিসরে লেখায় সব থাকবে। শুধুমাত্র আকৃতি-প্রকৃতিতে কিছুটা ভিন্ন হবে।
আমরা আমাদের এই ‘অনুভূতি’ সাহিত্য শাখার প্রত্যেকটি লেখাকে ধরবো সাহিত্যের ক্ষুদ্রতম একক হিসেবে। আমাদের একজনের দশ-পনেরটি লেখা একত্রিত করলে যেন একটি পরিপূর্ণ গল্পরূপ পায় আবার প্রত্যেকটি আলাদা লেখা যেন একটি পূর্ণ মনের ভাব বা কোন একটি ঘটনা প্রকাশ করতে পারে। প্রচলিত সাহিত্যের বই আকৃতির উপন্যাস বা গল্প থেকে মনে রাখার মত বা মানুষ নাড়া দেয় এমন একটি পৃষ্ঠা বা অর্ধেক পৃষ্ঠা’র লেখা যা স্বতন্ত্রভাবে একটি নির্দিষ্ট ঘটনা, আবেগ বা অনুভূতি প্রকাশ করে, তা তুলে ধরলে যেমন হবে তেমনি হবে আমাদের সাহিত্যের এই ধারার আকৃতি-প্রকৃতি।
আমরা দেখেছি, সাহিত্যে যেসব বিষয় তুলে ধরা হয় তার সব ক্ষেত্রেই ‘অনুভূতি’ নামক প্রত্যয়টি রয়েছে। তাই আমরা সাহিত্যের এই নতুন ধারাটিকে ‘অনুভূতি’ নামে অহিভিত করে বিকশিত করতে চাই। কেউ যেমন বলে আমি কবিতা বা গল্প লিখি, তেমনি প্রচলিত এই ধারায় লিখলে বলবে আমি ‘অনুভূতি’ লিখি। যিনি কবিতা লেখেন তাকে কবি, যিনি গল্প লেখেন তাকে গল্পকার, যিনি প্রবন্ধ লেখে তাকে প্রাবন্ধিক, যিনি ছড়া লেখেন তাকে ছড়াকার বলে। তেমনি আমরা চাই যিনি ‘অনুভূতি’ লেখেন তাকে ‘অনুভূতি লেখক’ বা সরাসরি ‘লেখক’ বলা হবে।
একটি বিষয় না বললেই নয়, পরিবর্তিত এই সময়ে এই ‘অনুভূতি’ নামের সাহিত্য ধারা বা সাহিত্যের শাখার প্রচলনও সময়ের দাবী। কারণ বর্তমান সময় তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশের এক যুগ-সন্ধিক্ষণ। এছাড়াও মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি যান্ত্রিক ও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এক সময় সাহিত্যের প্রকাশ-মাধ্যম ছিল ছাপার আকৃতিতে বই ও পত্র-পত্রিকা বা ম্যাগাজিন। এখন সেই স্থান দখল করেছে কম্পিউটার ও ইন্টারেনেটে ওয়েব। এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইয়ের লাইব্রেরীতে যতগুলো ছাপা আকৃতির বই আছে, সেই সমান সংখ্যক বই একটি ছোট ল্যাপটপ কম্পিউটারে অনায়াসেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে বা সফটকপি হিসেবে রাখা এবং পড়তে পারা সাধারণ ও সহজ একটি বিষয়। আর ইন্টারনেট বা ওয়েবের মাধ্যমেতো ক্লিক করা বা চাওয়া মাত্রই যে কোন বিষয়ে জানা সম্ভব। তাছাড়া মানুষ এখন বিভিন্ন ধরণের মাধ্যম যেমন ফেসবুক, ইউটিউব বা টুইটারের মাধ্যমে ছবি, ভিডিওচিত্র বা সচলচিত্র, নিজের মতামত বা লেখা এমনকি সাহিত্যকর্মও প্রকাশ করছে। যেখানে একটি ৫ থেকে ৬ মিনিট সময়ের গান শুনে শেষ করতেও মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বা অনাগ্রহ। দু’মিনিটের মধ্যে একটি গান শুনে শেষ করতে চায় বা নতুন ধারার গানের সময়ব্যপ্তি দুই মিনিট হোক-এই ধরণের চাওয়ার প্রস্তাব দেয় বা আলোচনা করে এই সময়ের তরুণ সমাজ। অনেক ক্ষেত্রে তাদের দাবী সরলীকরণ বা সহজ বা সংক্ষিপ্তকরণ। সময়ের প্রয়োজনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সময় দেয়ায় বড় ধরণের সাহিত্যকর্ম পাঠ করা থেকে কিছুটা হলেও দূরে সরে এসেছে। তাই পরিবর্তিত সময়ে সাহিত্যের নতুন এই ধারা ‘অনুভূতি’ যা সংক্ষিপ্ত তবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে এবং অনেকের মনকে আকর্ষণ করে সাহিত্যের নুতন ধারা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
আমাদের এই সকল মতের সাথে কারো ভিন্নমতও থাকতে পারে। আমরা সেই বিতর্কে যাব না বা যেতে চাই না। যদি কোনক্ষেত্রে আমাদের ভুল বা আমাদের মতের সাথে ভিন্নমত থাকে বা নতুন কোন চিন্তা-চেতনা বা প্রস্তাব থাকে তবে আমরা তা গ্রহণ করব।
আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে ‘অনুভূতি’ নামের মাসিক একটি ম্যাগাজিন বা লিটল ম্যাগ প্রকাশ করা এবং onuvuti.com ওয়েবসাইটে সার্বক্ষণিক এই ধারার সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখব। ‘অনুভূতি’ লেখার মাধ্যমে সকলের অংশগ্রহণ, সহযোগিতা ও দিক-নির্দেশনা কামনা করছি।

জহিরুল ইসলাম খান
সাহিত্যের নতুন ধারা ‘অনুভূতি’র প্রস্তাবক ও আহবায়ক।
মোবাইল: ০১৭১৬৫৪১৭৪৪, ০১৭১৩৫৮০৯৩০
E-mail: info@onuvuti.com, Website: onuvuti.com


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top