You are here: Home / অনুভূতি / রাজারবাগ ও প্রথম প্রতিরোধ

রাজারবাগ ও প্রথম প্রতিরোধ

Shadhinata‘বেস, ফর অল স্টেশন অব ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, কিপ লিসেনিং, ওয়াচ, উই আর অলরেডি অ্যাটাকড বাই দা পাক আর্মি, ট্রাই টু সেভ ইউরসেলভ, ওভার’। বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের সব স্টেশন, আপনারা মনোযোগ দিয়ে শুনুন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের আক্রমণ করেছে। আপনারা আত্মরক্ষা করার জন্য তৈরি হন।’
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে দেশের সব পুলিশ স্টেশনে ওয়ারলেসের মাধ্যমে যিনি এই বার্তাটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর নাম শাহজাহান মিয়া। ২৫ মার্চ রাতে তিনি রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের বেতার অপারেটর ছিলেন। হেলিকপ্টার ব্যাজের একটি বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে তিনি সারাদেশে বার্তাটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।
এরপর তো কেবলই ইতিহাস। ২৫ মার্চ কালোরাতে হাজার হাজার নিরস্ত্র বাঙ্গালিকে হায়েনারা সেদিন হত্যা করে। সশস্ত্র পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সেদিন প্রতিরোধের প্রথম গুলিটি ছুড়েছিলেন রাজারবাগের বীর পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। আর রাজারবাগ ছিলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধক্ষেত্র। কেবলমাত্র থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে আধুনিক একটি অস্ত্রে সজ্জিত পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সারারাত লড়েছিলেন বাংলার বীর পুলিশ সদস্যরা। আর এই প্রতিরোধযুদ্ধের বার্তা ওয়ারলেসে ছড়িয়ে গিয়েছিলো সারাদেশে। বুকের মধ্যে কি প্রচন্ড দেশপ্রমে আর সাহস থাকলে কেবলমাত্র ৩০৩ রাইফেল নিয়ে যুদ্ধ করা যায় সেটা দেখিয়ে দিয়েছিলো রাজারবাগ।
এগুলো কোন গল্প নয় হলিউড সিনেমার কোন কাহিনীও নয়। আমি যখন এই ইতিহাসগুলো পড়ি আমার পুরো শরীর উত্তেজনায় কেঁপে ওঠে। আনন্দে আমার চোখ দিয়ে অশ্রু বের হয়।
গত বছরের মার্চে রাজারবাগের সেই ইতিহাস জানতে আমি কথা বলেছিলাম বীর পুলিশ সদস্য শাহাজাহন মিয়ার সঙ্গে। কেমন ছিলো সেইদিন? শাহজাহান মিয়া আমাকে গল্পের মতো বলে যান, ‘আমরা আগেই অনুমান করেছিলাম ২৫ মার্চ কিছু একটা ঘটবে। বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা জানতে পারি রাজারবাগ পুলিশ লাইনস আক্রমণ হতে পারে। আমরা বুক ফুলিয়ে প্রতিরোধের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। আমি রাজারবাগ ওয়ারলেস বেইজ স্টেশনের দায়িত্বে। রাত ১১ টা ২০ মিনিটে সেনাবাহিনী পুলিশ লাইন ঘিরে ফেলে। এর কিছুক্ষণ পরেই আক্রমণ। এরপর শুরু হলো প্রচন্ড গোলাগুলি। আমি সারাদেশের জেলা ও সাবডিভিশন পুলিশে বেতার মারফত খবর দিলাম ‘বেস ফর অল স্টেশন অব ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, কিপ লিসেটেনিং, ওয়াচ, উই আর অলরেডি অ্যাটাকড বাই দা পাক আর্মি, ট্রাই টু সেভ ইউরসেলভ, ওভার’।
এরপরেই শুরু হলো প্রতিরোধযুদ্ধ। রাতভর যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন বীর পুলিশ সদস্যরা। নিহত হলেন অন্তত একশ পুলিশ সদস্য। বন্দি হলেন আরো দেড়শ।
রাজারবাগের অকুতোভয় বীর পুলিশ সদস্যরা বুকের রক্ত দিয়ে যে প্রতিরোধের সূচনা করলেন তা শুধু রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, বরিশাল, খুলনাসহ সারা বাংলাদেশের পুলিশ লাইনসগুলোতেও শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ।
মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মিয়া এখনো বেঁচে আছেন। বেঁচে আছেন তাঁর মতো অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা। এই বাংলাদেশে আছে মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর, হামিদুর রহমান, মোস্তফা কামাল, রুহুল আমিন, মতিউর রহমান, মুন্সি আব্দুর রউফ ও নূর মোহাম্মদ শেখের মতো বীরশ্রেষ্ঠ। আছে রুমীর মতো বীর মুক্তিযোদ্ধা।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পৃথিবীর যে কোন অ্যাডভেঞ্চার আর দেশপ্রেমের গল্পকে হার মানাবে। সেই ইতিহাস যদি আমরা জানতে পারি, আমাদের নতুন প্রজন্মকে জানাতে পারি তাহলে অসীম দেশপ্রেম নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারবো। স্বাধীনতা দিবসের এই প্রাক্কালে স্মরণ করছি সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।
image001লেখক: শরিফুল হাসান, সাংবাদিক, দৈনিক প্রথম আলো।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top