You are here: Home / অনুভূতি / যে অনুভুতি শুধুই অনুভবের

যে অনুভুতি শুধুই অনুভবের

:: ইমতিয়াজ আহমেদ ::
মনটা ভীষণ খারাপ তখন। ঈদের শেষ। মানুষের ব্যস্ততা বেড়ানোকে কেন্দ্র করে। আত্মীয়-স্বজন আসছে, যাচ্ছে। আমি কথা বলছি মেপে মেপে। হাসির কথায় হাসছি। দেখানোর জন্য। অথচ আমার মন থেকে হাসি আসছিল না। মাঝে মাঝে রাতে মনে হতো চোখের কোন গড়িয়ে দু’এক ফোটা পানিও ঝরছে নীল কষ্টে।
তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করতে, ‘এত বিষন্ন কেন আমি?’ খুব চেষ্টা করেছি স্বাভাবিক থাকতে। অথচ তোমার চোখে ঠিকই ধরা পরতাম। তেমন কিছু বলতে না তুমি। কেননা তোমার ভেতরেও ছিল অস্বাভাবিকতা। ব্যাধি বাসা বাঁধতে ছিল, যেটা তুমি বুঝতে পারতে। আমরা বুঝতে পারতাম না বা বুঝতে দিতে চাইতে না।
হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে পরলে। চিকিৎসা শুরু হলো। চিকিৎসা চলতে লাগলো আর তুমি আরো ভীষণ অসুস্থ হতে থাকলে সুস্থতার পরিবর্তে।
আমার আগের বিষন্নতা, কষ্ট উড়ে গেল মুহুর্তেই। কেউ দূরে সরে যাওয়ার বেদনার জায়গা দখল করে নিলে তুমি! ধীরে ধীরে তোমার অসুস্থতা আমাদের সব আনন্দ, কাজের গতি কেড়ে নিতে লাগলো। এমন একটা সময় অতি দ্রুতই আসলো যখন তুমি হাটতে পারছো না। অবশেষ ঢাকায় যেদিন যাচ্ছিলাম তোমাকে নিয়ে বেদনায় ভারী হয়ে উঠছিল আমার সব। চোখ বারবার ঝাপসা হয়ে আসছিল। কেন যেন মনে হচ্ছিল ‘এই তোমাকে’ নিয়ে ফিরতে পারবো না।।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তুমি অস্থিরতা প্রকাশ করতে। আমি সান্তনার ভাষাও হারিয়েছিলাম। তোমার কষ্ট দেখে। তখনও চিকিৎসা শুরু হয় নি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
এরই মাঝে আমাকে বাড়ি আসতে হলো হাসপাতালে তোমাকে ফেলে। দুদিন পর যখন আবার গেলাম ওষুধের অদ্ভুত গন্ধ মেশানো করিডোর পেরিয়ে ৩০৭ নং ওয়ার্ডে। দেখলাম তুমি ঘুমিয়ে। আমি নিরবে তোমার বিছানার পাশে বসলাম। তুমি টের পেয়ে শরীরের সবটুকু শক্তি এক করে আমার দিকে পাশ ফিরলে। এক হাতে আমাকে ধরে যেন শুনতে না পাই তেমন করে কাঁদতে লাগলে তুমি। আমি টের পেয়েছিলাম। আমার ভেতরটা বেদনায় মুষড়ে পরছিল। দাঁতে দাঁত চেপেও কান্না রোধ করতে পারি নাই। চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে আসছিল চোখের জলে। পাশের বেডে রোগীর স্বজন কিশোরী মেয়েটি তখন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল। আমি টের পেলাম কিশোরীটিরও চোখ চিকচিক করছে মৃদু জলে।
‘শূন্যতা ছুঁয়ে যায়’ নামের আমার দ্বিতীয় বইটির কাজ চলছিল তখন। উৎসর্গ লেখা বাকী ছিল। তোমার দিকে তাকিয়ে থেকে উৎসর্গটি লিখেছিলাম। তুমি তখন বিছানায় শুয়েছিলে মরার মত। লেখাটি ছিল এ রকম, ‘বইটির উৎসর্গ যখন লিখি, তখন আমার মা অসুস্থ। অনেকদিন ধরেই মায়ের অসুস্থতা আমাদের স্বাভাবিকতায় বাধ সেধেছে। ক্রমান্বয়ে অসুস্থ হতে থাকা আমার মায়ের মুখের দিকে তাকালে ভেতরটা শূন্যতায় ছেয়ে যায়। হুহু করে উঠে বুক। মা, আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন।’
হাসপাতালে প্রায় ২৫ দিনের চিকিৎসা শেষে বেশ সুস্থ হয়ে যখন ফিরলে তখন আমার মনের আকাশটা হয়েছিল স্বচ্ছ চকচকে মেঘহীন, আর বইছিল মৃদুমন্দ বাতাস। বুকটা বেশ হালকা হয়েছিল।
‘শূন্যতা ছুঁয়ে যায়’ বইটি তুমি যখন হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছিলে তখন স্বর্গীয় ভালো লাগায় ছেয়ে গিয়েছিল আমার পুরোটা স্বত্ত্বা। ভেতর-বাহির। সে এক অন্যরকম অনুভুতি! যে অনুভুতি প্রকাশযোগ্য নয়। শুধুই অনুভবের!

অনুভূতি লেখক: ইমতিয়াজ আহমেদ, সাংবাদিক, শিবচর, মাদারীপুর।
facebook.com/imtiajahmed.imon


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top