You are here: Home / অনুভূতি / মায়ের শূন্যতা

মায়ের শূন্যতা

Anzuman Julia (Ma Amar Ma):: আঞ্জুমান জুলিয়া ::

মাকে সব সময় খুব বেশি মনে পড়ে। যাই করি না কেন, যতো ব্যস্ত থাকি না কেন মাকে কখনো চোখের সামনে থেকে আড়াল করতে পারি না। আমার মা ছিলেন খুব সরল মনের মানুষ ও পরোপকারী। পরিবারের, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী যে কারোই কোন সমস্যা দেখলে না গিয়ে থাকতে পারতেন না। গৃহিনী হিসেবে রান্নার প্রতি ছিল প্রচুর আগ্রহ,বিশেষ করে পিঠা বানাতে খুব ভালবাসতেন। ছোটবেলা থেকে আমার সংস্কৃতির কর্মকান্ডের প্রতি ছিল ভালবাসা। পড়াশুনার পাশাপাশি নাচ, গান, নাটক করতাম। এত ব্যস্ত থাকতাম, মা আমাকে কখনো কোনো কাজের কথা বলতেন না। আমারও কেন জানি রান্নার প্রতি মনোযোগ ছিল না। বাবা মাঝে মাঝে বলতেন মেয়েকে রান্না-বান্না শেখাও, না হলে বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ির লোকজন বলবে যে মেয়ের তো কোনো গুণ নেই। মা বাবাকে বলতেন সময় হলে ঠিকই পারবে।
আমি ভাবতে পারিনি যখন তোমার কাজ থেকে আমার অনেক শেখার থাকবে তখন তুমি থাকবে না। কিছু ভুল হলে আমাকে কেউ হাতে ধরে শিখিয়ে দেবে না। সব সময় বলতো তুমি পড়ালেখা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে, চাকরি করবে। পড়াশুনার মাঝে বিয়ে হয়। তোমার দোয়ায় এমন একজনের সাথে বিয়ে হয়, যে সত্যি আমার সব দায়িত্ব নেয়। তুমি না ফেরার দেশে চলে যাবে বলেই হয়ত এমন একজন জীবনসঙ্গী পাই।
বিয়ের কয়েকদিন পর হঠাৎ যখন তুমি অসুস্থ হও, তখন আমার ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষার দেয়ার মনোবল হারিয়ে ফেলি। কিন্তু মা, তখন ও আমাকে বুঝিয়ে পরীক্ষা দেয়ায়। ক্রমাগত তুমি আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ো। ঢাকায় সিএমএস ভর্তি করা হয়। একটি পরীক্ষা হবার পর, একদিন ভোরে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই তোমাকে দেখে আবার রাতে চলে আসি। কিছু ভালো লাগে না। কবে পরীক্ষা শেষ হবে। শেষ হতে তোমার কাছে ছুটে যাই। মাত্র সাতটি দিন তোমাকে কাছে পাই। হঠাৎ একদিন আমাদের ছেড়ে তুমি না ফেরার দেশে চলে যাও। যেখান থেকে কখনও কোনভাবে তোমাকে ফিরিয়ে আনতে পারবো না। মা বলে ডাকতে পারবো না। সবার এত ভালবাসা, তারপরও কেন জানি মনে হয় আমি বড় দুর্ভাগা।
জানো মা, মা বলার সৌভাগ্য আমার নেই। তুমি মারার যাওয়ার একমাস পর আমার শ্বাশুড়ি মারা যান। আমি আর আমার স্বামী দু’জনই মা-হারা হই। না পারি আমি মাকে ডাকতে, না পারে আমার স্বামী মা বলে ডাকতে। কি ভাগ্য আমাদের দু’জনার তাই না।
সময় যেতে থাকে সময়ের নিয়মে। আমাদের জীবনও চলতে থাকে। একদিন আমিও মা হই। কোল জুড়ে আসে মানিকের ধন। সন্তানের দিকে তাকিয়ে তোমাকে একটু কম মনে পরার কথা। কিন্তু সন্তানকে নিয়ে সুখে-দুঃখে তোমাকে আরো বেশি মনে পড়ে। মনে পড়ে আমার মারও এমনি সুখে-দুঃখের দিন ছিল। আমাদের সুখে সুখ পেয়েছে, দুঃখে দুঃখ। এভাবেই দিন চলেছে। আজ তুমি কোথায়? শ্বশুর বাড়িতে প্রায় রাতে আমি তোমার কথা ভাবতেই অনেক জোরে জোরে কাঁদতাম। মনে থাকতো না কেউ শুনছে কিনা। কান্না করতে পারলে আমি শান্তি পেতাম।
একদিন আমার শ্বশুর আমাকে বললেন, এভাবে কান্দে কেউ, বলদির মত। চিরদিন কেউ থাকে না। আমাদের সবাইকে যেতে হবে।’ সবি বুঝি, কিন্তু মা তোমার কথা মনে পড়লে কিছুই ভালো লাগে না। এরই মাঝে মাস্টার্স পাস করি । ছেলে বড় হতে থাকে।
একদিন রাতে মা তোমার কথা মনে পড়ে কাঁদতে থাকি। ছেলেটা আমার ঘুম থেকে ওঠে বসে চোখের পানি মুছে দেয়, গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। আরো বেশি কাঁদতে থাকি। ও তখনও কথা বলতে পারে না। বার বার মনে হলো, সন্তানই বুঝি মায়ের কষ্ট বোঝে।
অন্য আরেকদিনের ঘটনা। আমার ছেলে জুনাইদের বয়স সাড়ে তিন বছর। আমাকে প্রশ্ন করলো, মা তোমার মা কোথায় থাকে? আমি বললাম ওই আকাশে থাকে। ও বললো কোথায় দেখা যায় না। বললাম, আকাশে তারা হয়ে আমাদের দেখে। চট করে জুনাইদ বললো, আম্মু আমি বড় হয়ে অনেক উঁচু বাড়ি বানাবো। তারপর উপরে ওঠে একটা লাঠি দিয়ে তারা খোঁচা দিয়ে তোমার কাছে আনবো। তাহলেতো তোমার আম্মু তোমার কাছে আসবে। কথা শুনে কান্না আটকাতে পারলাম না। এটা কি সম্ভব কখনো না। তুমি তো বুঝলে না, যারা না ফেরার দেশে চলে যায় তারা কোনোদিন আসে না।
আমার ছেলেকে আমি মা বলে ডাকতাম। অনেকে বলতো ও তো ছেলে, ওকে মা বলেন কেন? আমি বলতাম, মা নেই তো তাই। প্রায় তিন বছর পর আবার আমি সন্তান-সম্ভাবা হই। মনে মনে আল্লাহর কাছে দোয়া করি, এবার সত্যি সত্যি মা দাও। একটি মেয়ে যাকে মা মা বলে ডাকবো। আল্লাহ আমাকে মেয়ে-সন্তান দান করেন। ওকে দেখে আরো কাঁদতে থাকি। কিছুতেই থামতে পারছিলাম না। সবাই বলে কেন কাঁদছি, থামানো জন্য বোঝাতে থাকে। পরক্ষণেই সবাই বুঝতে পারে আমি মার কথা মনে করে কাঁদছি। আমি তো আমার মেয়েকে মা বলে ডাকি। মায়ের শূন্যতা পূরণ করতে চাই। তারপরও কেন শূন্যতা পূর্ণ হয় না! কেন ভুলতে পারি না! তুমি তো আমাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছ। আমি তো ভালো আছি। কেন তারপরও আমার ভালো নেই মনে হয়। সবার মতো আমারও যে তোমাকে জড়িয়ে ধরে রাখতে ইচ্ছা করে। তোমার বুকের মাঝে শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করে, যেমনটি আমার সন্তান বুকের মাঝে শুয়ে থাকে।
আট বছর হয়ে গেল চলে গেছ। কিভাবে শেষ হলো। মা সংসারের তোমার সেই ছোট্ট মেয়েটি আজ সংসার করছে, চাকরি করছে। তোমার কথা আমি রেখেছি। কিন্তু তুমি তো দেখলে না। আমার চাকুরীর টাকায় তোমাকে একটা কাপড়ও কিনে দিতে পারলাম না। আমার কি কোনো ভুল ছিল, আল্লাহ তার শাস্তি দিল। তোমাকে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে গেল।
মা ওই আকাশের থেকে তুমি আমাকে দোয়া করো। আমিও আকাশের বিশালতার দিকে তাকিয়ে ভেবে নেব মায়ের বুকেই আছি আমি।
মা আমার মা, তুমি খুব ভালো থেকো। খুব ভালো।

Anzuman Julia (Photo)অনুভূতি লেখক: আঞ্জুমান জুলিয়া
সাংবাদিক, মাছরাঙা টেলিভিশন,
দৈনিক বিশ্লেষণ ও দিনের শেষে।
রচনা ও প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০১৬
যোগাযোগ: fb.com/anzumanjulia


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top