You are here: Home / অনুভূতি / বংশ পরম্পরা

বংশ পরম্পরা

Onuvuti (Bangso Poromporoy):: জহিরুল ইসলাম খান ::

কয়েকদিন ধরে দুটি বিড়ালের বাচ্চা ঘরের মধ্যে আসে। একটি কুচকুচে কালো। অন্যটি সাদা, তবে দুএক জায়গায় কালো দাগও আছে মনে হল। মাঝে মধ্যে মা বিড়ালটিকেও দেখি। আমাকে দেখামাত্রই দৌড়ে ঘর ছাড়ে বিড়ালগুলো।
স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে জেলা শহরে আমার ছোট সংসার। ছেলের বয়স সাড়ে চার বছর আর মেয়ের বয়স দেড় বছর। দুজনেই ঘরের মধ্যে সব সময় দৌড়াদৌড়ি আর হুড়োহুড়িতে ব্যস্ত। এইতো মাস দুয়েক আগেও বিড়াল দেখলে ভয় পেত ছোট মেয়েটি, এখন আর তেমন ভয় পায় না। আর বড় ছেলেকে তখন দেখেছি বিড়ালের প্রতি কোন আগ্রহ বা অনাগ্রহ কোনটিই নেই।
লেখালেখির টেবিলে বসে ল্যাপটপে লিখছি। হঠাৎ স্ত্রীর উচ্চ কণ্ঠ, ‘আর দিবে না, দুবার ভাত দিয়েছ। ঘরের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ভাত ছড়িয়ে আছে। আর না!’
কী বিষয় জানতে বারান্দার দিকে তাকালাম। দেখি, আমার ছেলে বিড়ালের বাচ্চা দুটিকে ভাত খেতে দিচ্ছে। রাইসকুকার থেকে হাতে করে ভাত নিয়ে যাওয়ার সময় ঘরের বিভিন্ন জায়গায় ভাত পড়ছে তার প্রতি কোন খেয়াল নেই ছেলের। এই সাড়ে চার বছর বয়সে কখনও সে প্যান্ট পড়ে, কখনও ন্যাংটা থাকে। বারান্দায় যেখানে ফুলগাছের টবের সারি রাখা সেখানে ন্যাংটা হয়ে দাড়িয়ে বিড়ালের ভাত খাওয়া দেখছে। আমি ওর কাছে গিয়ে বললাম, ‘বাবা বিড়ালতো মাছ খেতে আর মাছের কাটা খেতে পছন্দ করে। ঘরের মধ্যে যেন ভাত না পড়ে। একটি বাটিতে করে দিও।’
দুদিন পর দুপুরে আমার ভাত খাওয়া শেষে ছেলে এসে দাড়িয়েছে পাশে। বললো, ‘বাবা আমাকে মাছ দাও।’ আমি বললাম, ‘বাবা তুমি ভাত খাও নি?’ ‘বিড়ালকে খেতে দেব’ ওর উত্তর। আমি মাছ দিচ্ছি না দেখে ও বললো, ‘বাবা তাহলে কাটাগুলো দাও। বারান্দায় বিড়ালকে খেতে দিয়ে আসি।’ ওর কথায় আমি ফিরে গেলাম প্রায় ত্রিশ বছর আগে আমার শৈশবের দিনগুলোতে।

গ্রামের অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তান আমি। গ্রামের পাটখড়ির বেড়া, ছনের ছাউনি দেয়া ঘরগুলোর মধ্যে আমাদের বাবা-চাচাদের তিন পরিবারের একুশাবন্দ টিনের ঘরগুলোই যেন আভিজাত্যের বাহ্যিক প্রকাশ ছিল। খুব ছোটবেলা থেকেই ঘরের মধ্যে গৃহপালিত বিড়াল দেখেছি সব সময়। কখন দুটো আবার কখনও চার-পাঁচটিও। বিড়ালগুলোকে পরিবারের সবাই কম-বেশি আদর করতো। কারণও ছিল। ঘর ভর্তি ধান-পাট, খেসারি-কলাই-মশুরি; বিড়াল থাকার কারণেই ইঁদুর থেকে ফসলের রক্ষা। অনেক সময় বিড়ালগুলোর মুখে শিকার করা ইদুর দেখতাম ছোটবেলা থেকেই। সব সময়ই বিড়াল ভাল লাগতো। কিন্তু রক্তাক্ত ইদুর মুখে নিয়ে ঘাড় উঁচু বিড়ালকে সেই সময়ের জন্য আপন মনে হত না। অনেক সময় ধানের গোলাসহ বিভিন্ন শষ্যের স্তুপের মধ্যে বিড়ালের শুকনো গুটি গুটি পায়খানার দলা দেখাও ছিল কিছুটা কষ্টের বিষয়।
শীতের রাতে লেপ-কাথার মধ্যে ঢুকে কখনও পায়ে কাছে শুয়ে থাকতো বিড়াল, কখনও বা বুকে কাছেও চলে আসত। বিড়ালগুলোর সাথে এক ধরণের মমতার সম্পর্ক ছিল পরিবারের সবার। সংসারের ছোট সন্তান হিসেবে আমার যেন একটু বেশিই টান ছিল বিড়ালের প্রতি।
বড় গৃহস্থ হিসেবে আমার বাবা-মায়ের দুজনেরই ছিল কমপক্ষে দুজন কাজের লোক। যারা গৃহস্থ বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের মত থেকে সংসারের দায়িত্ব পালন করে। এক কাজের লোক আমাকে বলেছিল, ‘বিলাই পায়খানা করে, হোচে না, গোসল করে না। আর সেই বিলাই তুমি ধরে কোলে নিয়ে হাটো।’
মাথায় চিন্তা ঢুকলো। তাইতো, কী করা যায়। বিড়ালের একটু বড় বাচ্চাকে পুকুরে নিয়ে ছুড়ে মারলাম পানিতে। সাঁতরে তীরে ওঠে এলো। ভাবলাম গোসল হয়ে গেছে। এখন কোলে নেয়া যায়। এভাবে মাঝে মাঝেই গোসলের জন্য পানিতে ফেলতাম বা গায়ে পানি ঢেলে দিয়ে গোসল করাতাম। বিড়ালগুলোকে বাচ্চা থাকা অবস্থায় আদর করতাম। বড় হয়ে গেলে কেন যেন দূরে সরে যেত। ছোট অবস্থায় আমার সাথে কত খাতির সেই বিড়াল বড় হয়ে গেলে আর কাছে ঘেষতো না। আমারও তার প্রতি আগ্রহ থাকতো না। কারণ বিড়ালের বংশবৃদ্ধিতে ওই বিড়ালের পরবর্তী প্রজন্মের ছোট বাচ্চাকেই পেতাম।
মনে আছে একটি বিড়ালের নাম দিয়েছিলাম ‘পাতলা খান’, কখনও বলতাম ‘নায়ক পাতলা খান’। ও গাছে চড়তে জানতো। আমিই শিখিয়েছিলাম। বেশ ছোট থাকতেই ওকে ছুড়ে দিতাম আমাদের বাঁকা একটি নারকেল গাছে। দৌড়ে নেমে যেত, আবার ধরে এনে ছুড়ে দিতাম। একটা সময় এসে দৌড়ে গাছে চড়া শিখে গেল। বাড়ির সবাইতো তাজ্জব। এমনকি নাম ধরে ডাক দিলেই আমার কাছে চলে আসতো। পরে বুঝেছি, নাম-ধাম আসলে কিছু না। জোরে আমার কণ্ঠ শুনেই হাজির হতো বিড়ালটি।
একদিন আমরা দেখি পাতলা খানের মুখে ছোট একটি সাপ। যার মাথা কামড়ে ছিড়ে ফেলেছে। ঘরের মধ্যে ঢোকা মাত্রই আমরা ভয়ে অস্থির। ও সাপটিকে মুখে নিয়ে দৌড়ে পেছনের বারান্দা পার হয়ে চলে যায় বাড়ির পাশে বাগানে। পরে ফিরে এলেও সাপটিকে খুজে পাইনি। আমাদের বাড়ির কাজের ছেলের ধারণা ছিল, সাপটি আমার রুমে ছিল। আমাকে রক্ষা করতেই বিড়ালটি সাপকে কামড়ে দেয়। তার কথায় অবশ্য কেউ তেমন গ্রাহ্য করেনি।
এর কয়েকদিন পর বিড়ালটি আস্তে আস্তে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। একদিন দেখি ঘরের পাশে নারকেল গাছের গোড়ায় বিড়ালটি মরে পরে আছে। বিড়ালটির মৃত মুখ আমার ছোট মনোজগতকে ওলট-পালট করে দেয়। সবাই জানতো বিড়ালটি ছিল আমার প্রিয়জনের মত। ওর মৃত্যুতেই আমার মনের মধ্যে মৃত্যুর প্রথম অনুভূতি। কান্না করেছিলাম তখন। আমরা তিন ভাই। আমার থেকে তিন-চার বছরের বড় আমার মেঝ ভাই তখন আমাকে বুঝিয়ে নিয়ে বাড়ির পেছনে একটি আম গাছের গোড়ায় কোদাল দিয়ে নিজে মাটি গর্ত করে কলাপাতা দিয়ে ঢেকে বিড়ালটিকে কবর দেয়ায়। আমার বুকের মধ্যে হাহাকার। কবরের পাশ থেকে ঘোর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে আসি আমরা দুই ভাই!

‘বাবা, কাটাগুলো দাওতো। বারান্দায় বিড়ালের বাচ্চাকে খেতে দিয়ে আসি।’ হঠাৎ ছেলের দৃঢ় কণ্ঠের আওয়াজে ত্রিশ বছর আগে থেকে বর্তমানে ফিরে আসি।
‘চল, বাবা।’ একটি বাটিতে করে কাটাগুলো নিয়ে বারান্দায় গেলাম বাবা-ছেলে দুজন। বিড়ালগুলোর পাশে ছেলের সাথে আমিও নীরবে দাড়ানো। আমার ছেলে বিড়ালের খাওয়া দেখছে। বিড়ালের জন্য আমার যে আগ্রহ ও ভালোবাসা ছিল, আমার ছেলের বুকের মধ্যেও কী এই মুহুর্তে সেই ভালোবাসার অনুভূতি। ত্রিশ বছর আগের আমার সেই অনুভূতি!

Zahirul Islam Khan (Photo)অনুভূতি লেখক: জহিরুল ইসলাম খান। সাংবাদিক, এটিএন নিউজ
সাহিত্যের বর্তমান ধারা ‘অনুভূতি’র প্রবর্তক।
রচনা ও প্রকাশ: মাদারীপুর, ১৩ জুলাই ২০১৫
যোগাযোগ: ০১৭১৬৫৪১৭৪৪


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top