You are here: Home / অনুভূতি / সব দিন যদি বিজয় দিবস হতো!

সব দিন যদি বিজয় দিবস হতো!

তাশরিক সঞ্চয়:

সেই রাতে ঘুম হতো না। কখন ভোর হবে! কখন হাড় কাঁপানো শীতে ঘর থেকে বেরুবো। বার বার হাতে নেড়ে দেখতাম পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখা জামা-জুতো আর সকালের সাজ। ঠিক যেন নির্মলেন্দুর কবিতায় … অমর কবিতা শুনতে অধীর আগ্রহে থাকা জনসমুদ্রের মতো। কাল যে ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ। আমাদের বিজয় দিবস। মাসখানেক আগে থেকেই কুচকাওয়াজের প্রস্তুতি আর আবৃত্তি, নাটক এবং সংগীত চর্চার কথা নাইবা বলি। কেবল যখন আঁধারের ঘোর কাটছে, পরিবারের কারও ঘুম ভাঙ্গেনি। কেবল মা জেগে আমার সাথে। বের হতাম ঘর থেকে, প্রথমে স্কুলের মাঠ। বাড়ির কাছে যে কবরস্থান ছিল, দিনের বেলাতেও মাঝে মাঝে তার পাশ দিয়ে যেতে ভয় পেতাম সেই সময়। কিন্তু নিজেও অবাক হতাম, যখন সেই কাক ডাকা ভোরগুলোতে আমার একটুও ভয় লাগতো না। ফেব্রুয়ারি, মার্চ আর ডিসেম্বর আসলেই মুক্তিযোদ্ধা বাবার কাছে যুদ্ধের গল্প শোনার স্প্রীহা বরাবরই বেড়ে যেতো। শুনতাম আর পাগলের মত সে সব অপারেশনে নিজেকে একজন যোদ্ধা চরিত্রে কল্পনা করে নিতাম। আমার যে বরাবরই ভালো কিছু, না পাওয়া কিছু কল্পনা করে নিতে ভালো লাগে। যে কথা বলছিলাম … সেই কাক ডাকা ভোরে স্কুলের মাঠে যাবার পথের দু’পাশে যত বন্ধু আর ছোট ভাই-বোন, তাদের ডেকে সাথে করে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বটা কেন যেন আমাকেই পালন করতে হয়েছে বছর সাতেক। স্কুল থেকে সকাল ৭টা নাগাদ পৌছাতাম কুচকাওয়াজের মাঠে। বেশ দূর থেকেই সেদিন সকালে কানে ভেসে আসতো দেশাত্ববোধক গান। চারপাশে পতাকায়, পোষাকে শুধু মায়া ভরা লাল-সবুজ। সে এক অন্য রকম ভালোলাগা। কুচকাওয়াজের জন্য যখন প্রস্তুত। তখন নিজেকে কিছুক্ষণের জন্য খুব বেশি দেশপ্রেমিক বা দেশের মঙ্গলযোদ্ধা মনে হতো। কেন হতো জানি না। সব ঠিক ছিলো । ক্ষমতার পালাবদল অনুযায়ী ক্ষমতাসীন নেতারা যখন মঞ্চে এসে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতেন, তখন সবচেয়ে অসহ্য লাগতো। কেন লাগতো সেটাও জানি না। পরে সকালের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকেলের প্রস্তুতি। অতঃপর সন্ধ্যারাতের অনুষ্ঠানগুলো শেষে যখন বাড়ি ফিরতাম। তখন আস্তে আস্তে সব দিকের দেশাত্মবোধ কেমন যেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতার নেতিয়ে পড়া পুঁই লতার মতো নেতিয়ে পড়তো। বুকটার মধ্যে হু হু করে উঠতো। মনে হতো সবদিন যদি বিজয় দিবস হতো! বিজয় নাকি আমাদের অনেক বড় প্রাপ্তি! কেন এসব মনে হতো সেটাও জানি না।
এখন আর অনুভূতিগুলো আগের মতো কাজ করে না। মুক্তিযোদ্ধা বাবা প্রথম কয়েক বছর যোদ্ধাভাতা পেয়েছেন, ঘরে কোন সার্টিফিকেট নেই। বাবা বলতেন, সেটি তিনি কখনোই চান নি, চানও না।
অনুভূতি কেন কমেছে! জানি না …
বাবার সার্টিফিকেট কেন নেই! জানি না …
বাবা কেন চান না! তাও জানি না …

Tasrik Sanchoyঅনুভূতি লেখক: তাশরিক সঞ্চয়, সংবাদ প্রতিবেদক ও উপস্থাপক, এসএ টিভি, ঢাকা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top