You are here: Home / অনুভূতি / আপনজনের লাশ দেখে চোখে একটুও পানি আসে নি!

আপনজনের লাশ দেখে চোখে একটুও পানি আসে নি!

যোগেশ চন্দ্র ঘোষ:
১৯৭১ সালে আমার বয়স ৩৫ বছর। তখন আমি পোষ্টমাষ্টারের চাকরি করতাম। দেশে যুদ্ধ লেগেছে সে কথা জানতাম। পাকবাহিনী হিন্দুদের প্রতি বেশি অত্যাচার করত। আমাদের এলাকার সবাই ছিল হিন্দুবসতি। আমরা আতঙ্কিত ছিলাম যে, পাক বাহিনী আমাদের আক্রমণ করতে পারে। ৫ জৈষ্ঠ্য আমাদের হিন্দু এলাকা পাকবাহিনী আক্রমণ করে। সেদিন আমি ব্যবসার কাজে বাহাদুরপুর ইউনিয়নের আলগী যাই। আমি আলগী গ্রামের জলিল কাজীর কাছে শুনতে পাই পাকবাহিনী আমাদের এলাকায় এসেছে। কথাটা শোনার পর আমার কলিজাটা ধপধপ করে কাঁপতে আরম্ভ করল। আমি কি করবো তা ভাবতে পারলাম না। নিজের জীবন নিয়ে পালাব, না বাড়ির খোঁজ নেব। সেখান থেকে একটু একটু করে বাড়ির দিকে এগোতে থাকলাম। মানুষজন ছোটাছুটি করছে। গুলির তীব্র আওয়াজ শুনতে পাই। আমি বাহাদুরপুরের হিন্দুপাড়া মালোবাড়ির খালপাড় আসি। সেখানে আসলে দেখি আমার বড় ছেলে সোনাতন দৌড়ে আসছে। ওর পেছনে অস্ত্র হাতে দুইজন মিলিটারি। আমি একটা ঝোঁপের ধার থেকে সোনাতনকে ইশারা করি। সোনাতন সাঁকো পাড় হয়ে এপার আসে। ভেবেছিলাম সোনাতনকে নিয়ে দূরে চলে যাব। সোনাতন আমার কাছ থেকে সাত থেকে আট হাত দূরে ছিল। মিলিটারি ওকে গুলি করে। গুলি ওর পিট ভেদ করে বুকের সামনে দিয়ে তিনটি ছিদ্র হয়ে বের হয়ে যায়। আমি সব ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে আমার সোনার মানিককে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। ওর গায়ের তাজা রক্ত আমার দেহে জড়িয়ে গেল। ও বার বার বিমর্ষ চোখে আমার দিকে তাকাতে লাগল, কিন্তু কিছু বলতে পারল না। আমি তখন কোন অবস্থায় আছি ভাবতে পারি নাই। সোনাতন আমাকে কিছু না বলেই মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ল। আমি অবাক হয়ে চিন্তা করলাম ওদের বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা আর পাষ-তা। পাঁচ বছরের মাসুম বাচ্চাও ওদের হাত থেকে রক্ষা পেল না। আমার দু’চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ল। আমার পাশে তখন কেউ ছিল না। আমি ওকে নিয়ে মালোবাড়ির পেছনে সতীশ মন্ডলের পাট ক্ষেতে রাখলাম। আমার ওখানে থাকা নিরাপদ ছিল না। আমি তিতিরপাড়া সৈয়দ মুন্সীর বাড়িতে যাই। তারা আমায় দেখে বুঝেছিল আমার গায়ে গুলি লেগেছে। আমি তাদের সব বললাম। সেখান থেকেও গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। বাড়ির অন্য সবার কি হয়েছে তা জানতাম না। মনটা ছটফট করছে। বিকেলে ওদের ধ্বংসলীলা বন্ধ হলে বাড়িতে আসি। মনে করেছি আমার কিছুই নাই। আবার আমি আমার সোনাতনের কাছে আসি। দেখি গায়ের রক্ত শুকিয়ে গেছে। মুখটা বির্বণ হয়ে গেছে। ওকে ওখানে রেখে বাড়ির দিকে আসি। দেখি লোকজন বাড়ি ফিরেছে, বাড়িতে আগুন জ্বলছে। বাড়িতে এসে আমার পরিবারের কাউকে দেখলাম না। বাড়ির আগুন নেভানোর কেউ নেই। সবার মনে আগুন জ্বলছে, কোন আগুন নিভাবে। বাড়ির উত্তর ঘাটপাড়ে কয়েকজন লোক দাড়িয়ে কোন মৃত ব্যক্তিকে দেখছে। আমি সেখানে গিয়ে দেখি আমার সত্তর বছর বয়সী মা বাসনা রাণীর লাশ। মায়ের কোলে আমার এক বছর বয়সী ছোট ছেলে প্রশান্ত। বন্দুকের বেয়নেট দিয়ে মায়ের কোমর থেকে আলাদা করে দিয়েছে ওরা। ছোট ছেলের মাথায় আঘাত দেখলাম। দুটি মৃতদেহ পাশাপাশি পড়ে রয়েছে। আপনজনের লাশ দেখে চোখে একটুও পানি আসেনি, বুকটা শুধু একটু কেঁপেছিল। মা খুবই বৃদ্ধ ছিলেন। বাড়ির বাইরে যেতে পারত না। ওরা হানা দেওয়ার সময় হয়ত জীবন বাঁচানোর জন্য পালাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাক বাহিনীর কাছে ধরা পড়ে জীবন হারায়। পর পর তিনজনের লাশ দেখলাম। স্ত্রীকে তখন পাই নাই। মনে করেছিলাম সে হয়তো মারা গেছে। হয়তো একটু পরে তার লাশ পাওয়া যাবে। চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে শোভা রাণী যার বয়স ছিল বিশ বছর সেও মারা গেছে। চাচাতো ভাই জগদীশ ঘোষ, তার স্ত্রী পুষ্প রাণীও মৃত। মাটিতে পাশাপাশি দুটি লাশ পড়েছিল। আমাদের পরিবারে মারা যায় ছয় জন। এলাকার শতাধিক লোক সেদিন মারা যায় ওদের হাতে। সন্ধ্যাবেলা আমার স্ত্রী বাড়ি ফিরে আসে। ছোট ছেলের লাশ দেখে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তার হাতে একটা গুলি লেগেছিল। সোনাতনকে পাটক্ষেত থেকে আনতে গেলাম। সাথে ছিল ভাইয়ের ছেলে শ্রীভাষ। সে ওকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। ওকে বাড়ি নিয়ে আসি। আমাদের সাহায্য করার কেউ ছিল না। লাশগুলো সৎকার করারও কেউ ছিল না। তাই বাড়ির সামনে দক্ষিণ দিকে ছয়টি লাশ একসাথে মাটি চাপা দিলাম। আমাদের সব কিছুই শেষ হয়ে গেল। বাড়িতে থাকা তখন নিরাপদ ছিল না। তাই পরের দিন বাড়ি থেকে আলগী কাজীবাড়ি চলে যাই। বেঁচে ছিল আমার স্ত্রী ও মেঝো মেয়ে রীণা। কাজীবাড়ির লোকেরা আমাদের এক মাস থাকার সব ব্যবস্থা করে। বর্তমান বাহাদুরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সৈয়দ শাখাওয়াত হোসেন সেলিমের মা আমাদের একদিনের খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। যুদ্ধের সময়ের প্রতিটি দিনের কথা আজও মনে পড়ে। আজ যদি আমার ছেলেরা বেঁচে থাকতো তাহলে অনেক বড় হত!
আজ ৩৯ বছর পরেও দেশে স্বাধীনতার সুফল আসে নাই। মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছে সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে। কিন্তু তা সফল হয় নি। কারণ এখনও দেশের ভেতরে রয়েছে দেশদ্রোহীরা। বর্তমান সরকার চায় দেশদ্রোহীদের বিচার হোক। আমি ঈশ্বরের কাছে কামনা করি তিনি এ বিচার সম্পূর্ণ করতে সহায় হবেন।
বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের প্রতি আমার অনুরোধ তারা দেশের দায়িত্ব কর্তব্যের প্রতি সচেষ্ট হবে, কিভাবে দেশকে উন্নতির দিকে নেওয়া যায় সেদিকে খেয়াল রাখবে। তাদের কাছে দাবি, তারা যেন বাঙালীর ঐতিহ্য রক্ষা করে। সকল কিশোর-কিশোরী মহান মুক্তিযোদ্ধার কাছে, সেই সময়ের নির্যতিত ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে যুদ্ধের কাহিনী শুনবে। তবেই তাদের মনে জন্ম নেবে এই চেতনা, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’।

অনুভূতি: যোগেশ চন্দ্র ঘোষ, দক্ষিণ দুধখালী, বড় ঘোষ বাড়ি, মাদারীপুর।
অনুলিখন: মিলন মুন্সী, সম্পাদনায়: জহিরুল ইসলাম খান, রচনাকাল: ২০১০ইং।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top