You are here: Home / অনুভূতি / ‘মাতৃভূমির প্রতি প্রেম সদা জাগ্রত থাকতে হবে’

‘মাতৃভূমির প্রতি প্রেম সদা জাগ্রত থাকতে হবে’

আলমগীর হোসাইন:
আমার বয়স তখন ২৩ বছর। আমি তখন করাচিতে বিমানবাহিনীতে চাকরি করি। ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে দেশের অবস্থা ভাল ছিল না। ১৯৭১ সালের ২১ মার্চ আমি মাদারীপুরে ছুটে আসি। দেশে যুদ্ধ শুরুর পর আর সেখানে ফিরে যাই নি। যোগ দিলাম মুক্তিযুদ্ধে। প্রথম আমারা মাদারীপুরেই শারীরিক ট্রেনিং করি। আমার নেতৃত্বে ৩০০ থেকে ৫০০ জনের একটি ছাত্রদলের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। এপ্রিল মাসে কর্নেল শওকত সাহেব এবং স্টুয়ার্ড মুজিবের নেতেৃত্বে ১৬৫ জনের একটি দলকে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য কলকাতায় পাঠানো হয়। আমি তখন ভারতে যাইনি। আমি ও শাজাহান খান এমপি মাদারীপুরে বাঙালিদের যুদ্ধে প্রেরণের জন্য উৎসাহ দিতাম ও যাওয়ার ব্যবস্থা করতাম। আমাদের কাছে তখন অস্ত্র হিসেবে ষ্টেনগান ছিল।
একদিন জনতে পাড়লাম ফরিদপুর দিয়ে পাকবাহিনী মাদারীপুর আসবে। তাই আমি শাজাহান খান (নৌ-পরিবহন মন্ত্রী), হাবিব অদুদ, পরিমল স্পীডবোটে পালং থানায় যাই ওদের প্রতিহত করতে। সেখান থেকে আমরা কুমিল্লা দিয়ে ভারতে যাই। ভারতে যেতে আমাদের ৫ দিন লাগে। আমরা মুজিব বাহিনীতে যোগাদন করি। যেখানে আমরা একমাস প্রশিক্ষণ নেই। বিভিন্ন অস্ত্র সম্পর্কে আমাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তা হলো এসএলআর, এসএমজি, টুইন্স হ্যান্ডগ্রেনেড, থার্টিসিক্স হ্যান্ডগ্রেনেড, ডিনামাইড, এক্সপ্লোসিভ ইত্যাদি। মুজিব বাহিনীর ক্যাম্প ছিল আলাদা। আমার খাবার-দাবার ভাল পেতাম। খাবারের কোন কষ্ট করিনি। ক্যাম্পে ৩টি ব্যারাক ছিল, ২০০ জনের মত বাঙালি ছিল। একমাস পর আমাদের আসাম থেকে আগরতলা নিয়ে আসে। কর্নেল শওকত সাহেব আমাকে খুজে বের করে। আমার সাথে সে অনেক কথা বলে। আমাকে মেলাঘর ক্যাম্পে এনে তিনি আমাকে ২নং সেক্টরের অধীনে মাদারীপুরের ১নং এরিয়া কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দেয়। আমি ১৭০ জনের প্রশিক্ষণ প্রাপ্তমুক্তির দল নিয়ে দেশে রওনা হই। তাদের মধ্যে ৪০ জন ছিল চালানোয় বিশেষজ্ঞ। তাদের লিডার ছিল মোহাম্মদ আলী। পালং থানায় আসলে ১২০ জন সেখানে থেকে যায়। আমি ৫০ জনের দল নিয়ে মাদারীপুর আসি। মাদারীপুরের মুক্তিবাহিনীর প্রথম ব্যাচের বাদল ও শাজাহান পাক হানাদারদের হাতে বন্দী হয়। এতে মুক্তির যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তছলিম আহমদ নেতৃত্বে আবার সবাই একত্রিত হয়। আমি তার সাথে যোগ দেই। আমাদের ক্যাম্প ছিল কালাগাছিয়া। সেখানে আমরা ৫টি বাড়িতে ক্যাম্পে স্থাপন করি। সেখানে আমরা একত্রে ৪০০ জনের মত মুক্তি থাকতাম। ক্যাম্পে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা ভাল ছিল না। এলাকার লোকের সাহায্যে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। আমাদের ক্যাম্পে তখন অস্ত্র ছিল এলএমজি, এসএলআর, এসএল মাইনড, ডিনামাইনড ইত্যাদি। মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যার মত অস্ত্র ছিল না। ক্যাম্প পরিচালানা করার জন্য বিভিন্ন কাজে লোক নিযুক্ত করা হয়। আমি ছিলাম এরিয়া কমান্ডারের ১নং কমান্ডার। আমার অধীনে এরিয়া ডেপুটি কমান্ডার ছিল খলিল খান। ১নং ক্যাম্প কমান্ডার ছিল-হারুন-উর-রশিদ, ২নং তছলিম আহমেদ, ৩নং গোলাম মাওলা, মাদারীপুর সদর থানার দায়িত্ব ছিল খলিল খানের উপর। রাজৈর থানায় কমান্ডার ছিল কাদের মোল্লা, কালকিনি থানায় কমান্ডার ছিল মালেক। আমরা প্রথমে পাকবাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করি। ওরা যাতে জনগণের থেকে কোন অর্থ আদায় না করতে পারে সে জন্য তহশিল অফিস সব আগুন দেই। আমরা কয়েকবার পাটগুদামে আগুন দেই। উদেশ্য ছিল আমাদের উৎপাদিত দ্রব্য দিয়ে যেন ওরা অস্ত্র ক্রয় না করতে পারে। কালকিনি থানা আক্রমণ করি। পাকবাহিনীর সাহায্যকারীদের আত্মসমর্পন করার আহ্বান করি। তারা না ফিরে আসায় তাদের হত্যা করা হয়। সমাদ্দার ও ঘটকচরে রাজাকার বেশি ছিল। ডিসেম্বর মাসে জয়ের আভাস পাওয়া যায়। দিন দিন মুক্তির সংখ্যা বাড়তে থাকে।
৭ ডিসেম্বর আমি ও কয়েকজন নৌকায় করে শিবচর যাচ্ছিলাম। পথে মধ্যে শুনতে পেলাম সামনে পাকবাহিনী এ্যামবুশ করে আছে। তাই না এগিয়ে আমরা ফিরে আসি। এ.আর হাওলাদার জুট মিলে পাকবাহিনীর ক্যাম্প। ৮ ডিসেম্বর ক্যাম্প থেকে পাকবাহিনী ফরিদপুর যাইতে ছিল। আমরা তাদের আক্রমণ করি। শুরু হয় লড়াই। এ লড়াই ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে। ওই দিন শহীদ হয় সরোয়ার হোসেন বাচ্চু। সন্ধ্যায় পাকবাহিনীর মেজর হামিদ খটক আমাদের কাছে আত্মসমর্পন করে। আমরা জয় লাভ করি।
বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীর বিচারের কার্যক্রম শুরু করায় আমি স্বাগত জানাই। ওদের বিচার না হলে মুক্তিযুদ্ধ অসম্পূর্ণ থাকবে। আমার একান্ত স্বপ্ন যুদ্ধাপরাধীর বিচার করে মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবময় ইতিহাস বাস্তবিক হোক। ওদের কারণে পাকবাহিনী পেরেছে বাঙালির উপর অমানুষিক নির্যাতন করতে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলে মুক্তির আশা পূর্ণ হবে।
বর্তমান প্রজন্ম জানে না মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। কিন্তু বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তাদের যুদ্ধের ইতিহাস জানতে হবে। এজন্য আমি পরিকল্পনা করেছি ডিসেম্বর মাসে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গল্পের আসরে তাদের যুদ্ধের কাহিনী শোনাবো। তাদের ইতিহাস জানানোর দায়িত্ব মুক্তিযোদ্ধাদের। এছাড়া নাটক-এর মাধ্যমে তাদের যুদ্ধের কাহিনী জানাবো। আমি মনে করি প্রত্যেকেরই মাতৃভূমির প্রতি প্রেম আছে। এই প্রেম সদা জাগ্রত থাকতে হবে। তারা দেশের জন্য নিজের স্বার্থকে ত্যাগ করে। সবাইকে দেশাত্মবোধক গান শোনার অনুরোধ করছি। দেশের প্রতি তাদের ভালবাসা থাকবে অকৃত্রিম।

অনুভূতি: আলমগীর হোসাইন, যুদ্ধকালীন ২নং এরিয়া কমান্ডার, মাদারীপুর।
অনুলিখন: জহিরুল ইসলাম খান, সাক্ষাৎকার গ্রহণ: মিলন মুন্সী।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top