You are here: Home / অনুভূতি / সহযোদ্ধারা মনে করেছিল আমি মারা গেছি

সহযোদ্ধারা মনে করেছিল আমি মারা গেছি

শাহজাহান হাওলাদার:
১৯৭১ সালে আমি নাজিমউদ্দিন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর পরীক্ষার্থী। রাজনীতিতে ওতপ্রোতভাবে ছাত্রলীগে জড়িত ছিলাম। আন্দোলনের মধ্যে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান। আমি যুদ্ধের জন্য ভারতে যাই। আমার নেতৃত্বে ২১ জনের একটি দল নিয়ে ভারতে যাই। আমার দলে ছিল মোক্তার হোসেন, আনোয়ার কাজী, ছালাম ঢালী, হাবিব ঢালী। প্রথমে আমরা ভারতের ঢালীখোলা ইয়ূথ ক্যাম্পে আস্থান করি। সেখানে ১৫ দিনের থাকি। ওই ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ মুজিব বাহিনী গঠিত হয়। মুজিব বাহিনীতে শুধু ছাত্ররা যোগদান করতে পারতো। বিশেষ ট্রেনিং জন্য ছিল মুজিব বাহিনী। কলেজের ছাত্রদের মুজিব বাহিনীতে যোগদান করতে দেখে আমিও যোগদান করি। আমরা সঙ্গীরা ওই ক্যাম্পে থাকে। আমরা (মুজিব বাহিনী) বিমান যোগে উত্তর প্রদেশের সার্জন বিমান বন্দরে নামি। সেখান থেকে আর্মির গাড়িযোগে টেন্ডুয়া ক্যাম্পে যাই। টেন্ডুয়া ক্যাম্পে ব্রিটিশ আমল হতে আর্মিদের প্রশিক্ষণ দিত। এ ক্যাম্পে আমাদের হায়ার ট্রেনিং দেয়া হয়। আর্মিরা দেড় মাস ট্রেনিং করায়। বেশ কয়েকটি অস্ত্র সম্পর্কে ট্রেনিং নেই। অস্ত্রগুলো এসএলআর, এলএমজি, রাইফেল, এক্সালো জি ৩, মর্টার, গ্রেনেড, এন্টি পার্সনাল মাইন ইত্যাদি। আমরা গেরিলা প্রশিক্ষণ নেই। অস্ত্র প্রশিক্ষণের সাথে আমাদের রাজনৈতিক ক্লাস নিতো। এখানে বিপ্লবী মানুষের জীবনী আলোচনা করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা দিতে। এখানে গেরিলা ট্রেনিং খুব কষ্টের ছিল। সেই ট্রেনিং সম্পূর্ণ করেছি। প্রতিদিন দিনের বেলায় ১০ ঘন্টা ট্রেনিং চলতো। ট্রেনিং চলাচালে যদি কোন অন্যায় করা হতো, তা হলে কঠিন শাস্তি দিতো আমাদের। ট্রেনিং দিয়েছে এসডি শর্মা ও জেনারেল ওবান। মুজিব বাহিনী গঠিত হয়েছে আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, শেখ মনি, ও সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে। সেখানে আমার ব্যাচ নং ছিল ৫। প্রশিক্ষণ শেষে আমরা পশ্চিম বাংলায় বারাকপুর আসি। বারাকপুর এক সপ্তাহ কাটাই। এখানে আমরা শাজাহান খানের সাক্ষাৎ পাই। আমরা মাদারীপুরের মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হয়ে একটি দল তৈরি করি। এ দলের ডেপুটি কমান্ডার ছিল শাজাহান খান। প্রয়োজনীয় অস্ত্র সাথে নিয়ে আমরা যশোর হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করি। আমরা যশোরের গ্রান্ডট্রাক রোডে সামনে পাক সেনাদের সম্মুখীন হই। তখন সন্ধ্যা নেমে রাত্র হয়েছে। পাক সৈন্যরা আক্রমন করলে আমরা একটি আখ ক্ষেতে আশ্রয় নেই। আখক্ষেতে ছিল পানি। সেই রাত্রটি আখক্ষেতে কাটাতে হয়েছে। পরের দিন গাইড আমাদের খুঁজে বের করে। যশোর থেকে পাংশা আসি। সেখানে পাকসৈন্যদের সাথে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয় মতিন। ওখানে ৮দিন থাকে। সেখান থেকে চলে আসি রাজৈর সরোয়ার মোল্লার ক্যাম্পে। সরোয়ার মোল্লার ক্যাম্প ছিল কাজী বাড়ি। মাদারীপুর এসে আমাদের প্রথম অপারেশন হয় কবিরাজপুরের কালামৃধা। এখানে আমরা পাকসৈন্যদের রসদভরা লঞ্চে আক্রমণ করি।
টেকেরহাটের নদীর দক্ষিণ পাশে ছিল পাক ক্যাম্প। এই ক্যাম্পে আমরা গেরিলা আক্রমণ করলাম। আমাদের কাজ ছিল পাক সৈন্যদের আতঙ্কে রাখা। যাতে ওরা সুস্থ থাকতে না পারে। ঈদের একদিন আগে ক্যাম্পে সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম ওদের ঠিকমত ঈদ করতে দেব না। রাজৈর থানায় আক্রমণ করতে হবে। রাজৈর থানায় আক্রমণ করার জন্য নেতৃত্ব দেয় সরোয়ার হোসেন মোল্লা। ঈদের আগের রাত্র ১২টার দিকে রাজৈর থানা আক্রমণ করা হয়। রাজৈর থানা আক্রমণ করার পর রাত্রে টেকেরহাট থেকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা বৌলগ্রাম ব্রীজে দক্ষিণ পাশে ফাঁদ করে এ্যামবুশ করে থাকি। ব্রীজের দক্ষিণ দিকে নামার এন্টিপার্সোনাল মাইন পুতে রাখি। আমার সাথে ছিল শফিকুল, ইরাদ, আতাহার চৌধুরী, মোকলেচুর রহমান বেপারী। আমরা রাজৈর থানা আক্রমণ করার জন্য থানার দিকে আসতে থাকি। ব্রীজ থেকে নামলে মাইন বিস্ফোরণ হয়। এতে জিপ গাড়ি দুটি বিধস্ত হয়। আমরা একত্রিত হয়ে অপারেশন করে বদরপাশা যাই। সেখানে ঈদ পালন করি। নভেম্বর মাসে আমরা শিরখাড়া ক্যাম্পে আসি। শিরখাড়া ক্যাম্পে মাঝে মাঝে অপারেশন কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করতাম। শিরখাড়া ক্যাম্প থেকে গেরিলা নিয়ে রাজাকারের ক্যাম্পে অপারেশন করতাম। সমাদ্দার ব্রীজের কাছে খলিল খানের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাই। সেখানে পাকসৈন্যদের জিপের সামনে পড়ি। জিপ দেখে ব্রাশফায়ার করে সরে পড়ি। তখন দুপুর বেলা। ফায়ার করে আখক্ষেতের মধ্যে উত্তর চরদৌলতপুর আসি। ওইদিন সমাদার ব্রীজের উত্তর পাশে গ্রামে যাই। পাকসৈন্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে সমাদার ব্রীজের উত্তর পাশে গ্রামে ঢুকে আক্রমণ করে। আক্রমণে কিছু সংখ্যক মানুষ প্রাণ হারায় এবং কয়েকটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এই অভিযানের পর আমার প্রচ- জ্বর হয়। আমি কালিরবাজার এক ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নেই। তাই দুই দিন ক্যাম্পে যাইতে পারি নাই। এতে ক্যাম্পের সহযোদ্ধারা মনে করেছিল আমি মারা গেছি। আমার চাচাত ভাই আব্দুল জলিল বলে, তোর জন্য আমরা কান্নাকাটি করেছি ও মিলাদ পড়িয়েছি। ৩ ডিসেম্বর আমি খোয়াজপুর ক্যাম্পে অবস্থান করি। ওই ক্যাম্পে থাকাকালে দুপুর বেলা একটি পাক-হেলিকপ্টার জুট মিলের দিকে আসে। আমি ক্যাম্পে বসে হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করি। আমার করা গুলি হেলিকপ্টারে লেগেছে। জুট ক্যাম্পের মেকানিজ সেদি আমাকে জানিয়েছিল, গুলি লেগেছে কিন্তু কোন ক্ষতি হয়নি, তেলের ট্যাঙ্কে লাগলে ক্ষতি হত।
৮ ডিসেম্ভর রাত্রে শুনতে পাই পাক-আর্মিরা জুটমিল ত্যাগ করেছে। আমি আমার সহযোদ্ধাদের নিয়ে ভোর বেলা মাদারীপুর থানা ঘেরাও করি। তৎকালীন ওসি স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পনের প্রস্তাব দেয়। আমরা পুলিশদের জিম্মি করে অস্ত্র নিয়ে নেই। অস্ত্রগুলো থানার কক্ষে রেখে তালা বন্ধ করি।
সেখান থেকে আসি বদরবাহিনীর ক্যাম্প ফায়ার ব্রিগেড (বর্তমানে ফায়ার সার্ভিস)। পুরানবাজার স্টেশন আসলে নাজিমউদ্দিন কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপাল এম.ইউ. ভুইয়া স্যার আমাদের আসতে নিষেধ করেন। তিনি জানান, বদরবাহিনী আত্মসমর্পন করবে না, ফাইট করবে। তাই আমরা ক্যাম্প তিন দিক থেকে ঘেরাও করি, দক্ষিণ দিক ছিল শুধু ফাঁকা। ঘেরাও করার পর এমইউ ভূইয়া ১১টার দিকে জানায়, বদরবাহিনী আত্মসমর্পনের জন্য রাজি হয়েছে। বদর বাহিনীর কমান্ডার ইউনুস আলী খান অস্ত্র জমা দিয়ে তার দল নিয়ে আত্মসমর্পন করে।
তারপর এ.আর. হাওলাদার জুট মিলে পাক ক্যাম্পে যাই। সেখানে যে পাকসৈন্য ছিল তা সহজে চোখে পড়ার মত দৃশ্য দেখি। অনেক নষ্ট অস্ত্র ও গোলা বারুদ পাই। যারা সেখানে বন্দি ছিল তাদের আত্মীয় এসে তাদের ছাড়িয়ে নেয়।
শেষে সমাদার ব্রীজের যুদ্ধে যোগ দেই। ১০ তারিখ সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে পাকসৈন্যরা আত্মসমর্পন করে। এখানে শহীদ হয় বাচ্চু শরীফ। কয়েকজন যোদ্ধা আহত হয়। কিছুসংখ্যক যোদ্ধারা মারা যায়। প্রায় ৩৫ জনের মত পাকসৈন্য আটক হয় আমাদের কাছে।

অনুভূতি: শাহজাহান হাওলাদার, কমান্ডার, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মাদারীপুর জেলা ইউনিট।
অনুলিখন: মিলন মুন্সী, সম্পাদনায়: জহিরুল ইসলাম খান, রচনাকাল: ২০১২ইং।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top