You are here: Home / অনুভূতি / মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা

সুলতান বেপারী:
১৯৭১ সালে আমার বয়স ১৪ থেকে ১৫ বছর। দেশে যুদ্ধ লেগেছে সে কথা শুনেছি। রেডিওতে চরমপত্র নামে যুদ্ধের খবর শুনতাম। যুদ্ধের সব খবর চরমপত্র খবরে প্রচার করা হত। একদিন সন্ধ্যা বেলায় চরমপত্র খবর শোনার জন্য মাদারীপুর সদর উপজেলার দুধখালী ইউনিয়নের বোয়ালিয়া গ্রামের মান্নান মোল্লার বাড়িতে যাই। খবর শুনে আমি রাত্রে ওখানেই থাকি। ওই দিন ৪ জৈষ্ঠ্য। মান্নান ভাই আওয়ামীলীগের নেতা ছিল। মিলিটারীর ভয়ে তিনি বাড়িতে থাকতেন না। সেই দিন তিনি বাড়িতে থাকে। আমি ও মোতালেব মোল্লা ঘরের উপরের তলায় ঘুমাই। ভোর রাত আনুমানিক ৪টার দিকে দরজায় লাথির শব্দ শুনি। আমরা ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে গেলাম। মুহুর্তের মধ্যেই পাক-মিলিটারী ঘরে প্রবেশ করে। ঘরে ঢুকেই আমাকে ও মোতালেব মোল্লাকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসে। একজন মিলিটারী আমাদের দুজনকে দড়ি দিয়ে হাত পেছনের দিকে দিয়ে বেঁধে রাখে।

আমার কলিজা তখন দপ্ দপ্ করছিল। সারা শরীর কাঁপছিল। আমি এতই ভয় পাচ্ছিলাম যে মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না। মান্নান ভাই মিলিটারীর টের পেয়ে একটি চাদর মুড়ো দিয়ে দোতলা থেকে লাফ দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মান্নান ভাই গাছের সাথে আঘাত খায়। পাক-মিলিটারী চারদিক থেকে তার বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছিল। ভাই মাটিতে পড়ে জীবন বাঁচানোর জন্য দৌড় দেয়। মিলিটারী তাকে পেছন থেকে পর পর দুটি গুলি করে। গুলি দুটি তার পায়ে লাগে। তিনি আর দৌড়াতে পারেন নি। পুকুরের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুকুরের ওপাড়ে গিয়ে মাথাটা একটু পানির উপরে রেখে যন্ত্রণায় কাতরাতে ছিল। আমি সব কিছু দেখছি, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। মুখোশ পরা কয়েকজন (চারজনের বেশি) বাঙালি (পাকিস্তানী দোসর) দেখলাম। অন্ধকারে তাদের চেনা যাচ্ছিল না। ভাইকে পুকুরের পার থেকে উঠিয়ে বুকের উপরে দুটি গুলি করে হানাদার পাকবাহিনী। গগণবিদারী একটি চিৎকার দিয়ে ভাইয়ের কণ্ঠ চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়।
আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হল না, চোখ দিয়ে অশ্রু পড়ছিল। মনে করেছিলাম ভাইয়ের মত আমাকেও গুলি করে মারবে। মোতালেব এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পাক-মিলিটারী ওকে কয়েকটা লাথি দিয়ে ছেড়ে দেয়। চারদিক একটু ফর্সা (পরিষ্কার) হল। মুখোশ পরা বাঙালিদের চিনতে পারলাম। তারা হলো সোবাহান ওরফে কুটি মিয়া চৌধুরী (চন্ডিবর্দী), লতিফ হাওলাদার (হাউসদী), আনিস হাওলাদার, মুজিবুর হাওলাদার (হাউসদি), রব খালাসি (দুধখালী)। কুটি মিয়া ও মুজিবুর হাওলাদার এখনও জীবিত। অন্য সবাই দেশের সাথে বেইমানি করে দেশের মাটিতেই চিরনিদ্রায় শুয়ে আছে।
আমাকে নিয়ে জাউল্গা (জেলে) ঘাটে নিয়ে আসে। পথে বোয়ালিয়ার ছত্তার ভাইকে আটক করে। জাউল্গা ঘাটে আসার পর দেখি কয়েকটি ছোট নৌকা। একটি নৌকার মাঝি ছিল রব খালাসী। আমি তাকে দেখে সাহস পেলাম। বুঝলাম, রব ভাইকে বলে ছাড়া পাব। আমি তাকে করুণ কন্ঠে বললাম, ভাই আপনি ওদের বলে আমাকে ছাড়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু সে আমাকে বলল, ‘তোকে কি ছাড়বে শালা, তোকে গুলি করে মারবে।’ তার কথা শোনার পর আমার জীবনের মায়া শেষ হয়ে যায়। হাত বাঁধা অবস্থায় নৌকায় করে মিঠাপুর বাজারে নেয়া হয়। মিলিটারীরা খালেরপাড় দিয়ে বাজারে যায়। বাজার থেকে মিলিটারীরা শিকদার বাড়ি যায়। রাজাকাররা পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। আমাকে ও ছত্তার ভাইকে ৭ থেকে ৮জন মিলিটারী নিয়ে ভূইয়া বাড়ি (হিন্দু বাড়ি) যায়। বর্তমানে এই ভূইয়া বাড়িতে বসবাস করে ইসলাম জমাদ্দার। মিলিটারী টের পেয়ে ওই বাড়ির লোকজন পালাতে থাকে। কিন্তু সবাই পালাতে পারেনি। ওই বাড়ির নারায়ণ সাহা ও তার ভাই পরেশ সাহাকে গুলি করে মারে। নারীদের প্রতি চালায় নির্যাতন। আমি সব কিছু চোখে দেখেছি, কিন্তু কিছুই করতে পারিনি। শেষে বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগ করে। মিলিটারী আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘হিন্দু বাড়ি কিদার হ্যায়।’ আমি কিছুই বলিনি। মিলিটারীরা হিন্দু পেলে গুলি করত, মুসলমান পেলে আটক করত। সেখান থেকে সিকদার বাড়ি ফেরার পথে মিঠাপুরের খলিফা বাড়ির খালেক খলিফাসহ ৬ থেকে ৭ জন আটক করে। সিকদার বাড়িতে অসংখ্য লোককে হত্যা করে। বর্তমান স্কুলের লাইব্রেরীর সামনে আমাদের সারি বেঁধে বসানো হয়। একজন অফিসার আমার সামনে চেয়ারে বসে। অন্য একজন মিলিটারী একটি শালকাঠের লাঠি দিয়ে পিটানো আরম্ভ করে। পিটানোর চোটে অনেকেই প্রসাব ও পায়খানা করে দেয়। আমি ছোট বলে আমাকে পিটায় নি। আমি যদি তার একটি খেতাম তাহলে আলু ভর্তা হয়ে যেতাম। পিটানো শেষ হলে মিলিটারী একটি রুমের কাছে গিয়ে দাড়ায়। রুমটি ছিল বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। মিলিটারী রুম থেকে শব্দ শুনতে পায়। তালাবদ্ধ রুমটির দরজা ভেঙ্গে ফেলে। মিলিটারী দেখতে পায় ৮ থেকে ৯ জন হিন্দু জীবনের ভয়ে তারা রুমে পালিয়ে ছিল। কিন্তু জীবন তাদের রক্ষা হয়নি। অফিসারের হুকুমে রুমের ভেতর ব্রাশফায়ার করা হল। কেরে নিল সবার প্রাণ। রুমটি রক্তে লাল হয়ে যায়। আমার হৃৎপিন্ডের স্পন্দন তখন বন্ধ হয়ে যায়। জানি না কখন আমি তাদের মত লাশ হয়ে যাই। সিকদার বাড়ির চারপাশে ওদের হাতে শতাধিক লোক প্রাণ হারায়। হিন্দু এলাকার বাড়িঘর অগ্নি সংযোগ করে। সকাল ৯টায় ওদের ধ্বংসলীলা থামায়। আমাদের নিয়ে ওদের মূল ক্যাম্প মাদারীপুর এ. আর. হাওলাদার জুট মিলের দিকে রওনা হল। বর্তমান মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিবাজার থেকে হাউসদী পর্যন্ত যে খাল প্রবাহিত হয়েছে সেই খালের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। মিলিটারীরা সারি বেধে সবার সামনে চলছে। একজন মিলিটারী আমাদের দড়ির সাথে বেধে গরুর মত টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। যারা পিটানি খেয়েছে তারা হাটতে পারে না। তবুও বন্দুকের গোড়া দিয়ে আঘাত করে হাটায়। আমি সবার পিছনে ছিলাম। শুনেছি ওদের ক্যাম্পে নিয়ে গুলি করে মেরে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়। তার আগের দিন ৪ জ্যৈষ্ঠ মাকে দেখেছি। মাকে দেখার জন্য আমার প্রাণ ছটপট করছিল। সেখানে নিয়ে আমাকেতো মেরে ফেলা হবে। মাকে দেখতে পাব না, মাও আমার লাশ দেখতে পাবে না। আমি চিন্তা করলাম যেভাবেই হোক আমাকে পালাতে হবে। পালানোর সময় যদি ওরা গুলি করে তাহলেও আমার লাশটা মা দেখতে পাবে। হাতের বাঁধন খুলতে চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণ পর হাতের বাঁধন খুললাম। সুযোগ বুঝে দৌড় দিলাম। পিছনে কি ঘটছে কিছুই দেখিনি। এক দৌড়ে আমি পথের আইলে আসি। পথের এই আইল বর্তমান চরমুগরিয়া-শ্রীনদী প্রধান পাকা সড়ক। সেখানে এলে মাকে দেখতে পাই। মা আমাকে ডাকতে ডাকতে আসছিল। মিলিটারী টের পেলে বাঁশি বাজায়, কিন্তু গুলি ছোড়েনি। আমি মাকে নিয়ে গ্রামে ঢুকে যাই। সেদিন কিভাবে যে বেঁচে গিয়েছি তা বলতে পারব না। আল্লাহ্তায়ালা তার সুন্দর পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাকে সেদিন ওদের হাতে মরতে হয়নি।
পাক-মিলিটারী চলে গিয়েছে। আমার জীবন আমার কাছে ফিরে এল। হত্যাকান্ডের খবর চারদিক ছড়িয়ে পড়ল। সবাই আমাকে দেখতে আসে। আমি তখন ক্লান্ত ছিলাম। মান্নান মোল্লাকে হত্যা করার কাহিনী সবাইকে বলি। দুপুরে তাকে দাফন করা হয়। এলাকার সবার মনে শোকের ছায়া নেমে আসে। সেদিনের সেই শোক থেকেই আমার মনে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে ওঠে।
এর কিছুদিন পরে যুদ্ধে যাই। সে অনেক কথা। যুদ্ধের সময়ে প্রতিটি দিন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এক একটা দিনের ঘটনা এক একটা ইতিহাস। যুদ্ধের সময়ের ঘটনা আজও স্পষ্ট মনে আছে। সেই কথা মনে হলে মনের আবেগে চোখের জ্বল রাখতে পারি না। যুদ্ধের ৯টি মাস কষ্টে কাটিয়েছি। ভারতের বীরভূমে যুদ্ধের জন্য এক মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছি। সেখান থেকে আমাকে ও এলাকার তৈয়ব ভাইকে সেনাবাহিনীর সৈনিক বানানো হয়। আমাদের যশোর যুদ্ধ করার জন্য পাঠানো হয়। শত কষ্টে ৫ ডিসেম্বর যশোরকে শত্রু মুক্ত করি। জয় হওয়ার একমাস পর বাড়ি আসি। সেখানে সেনাবাহিনীর চাকরি করেছি।
দেশ স্বাধীন হল। বঙ্গবন্ধু দেশে এসে দেশের ভার গ্রহণ করল। স্বাধীন বাংলাকে সোনার বাংলা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু দেশের চির শত্রুরা ১৯৭৫ সালে ১৫ আগষ্ট তাকেসহ তার পরিবারের সকলকে হত্যা করে। দেশের চির শত্রুরা দেশকে ধ্বংস করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র করে। দেশের চিরশত্রুর জন্য আজও আমরা সোনার বাংলা পাই নি।
আজ ৩৯ বছর পরও দেশের চিরশত্রুরা দেশকে ধ্বংস করছে। তারা যুদ্ধের পাক-মিলিটারী সাহায্য করে দেশকে করেছে পঙ্গু। আর যেন তারা দেশের কোন ক্ষতি না করতে পারে সে জন্য তাদের (রাজাকার) বিচার করা উচিত। যদি বর্তমান সরকার রাজাকারের বিচার করতে অক্ষম হয় তাহলে স্বাধীনতার সুফল কখনও পাওয়া যাবে না। তাদের বিচার করে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া উচিত যে, দেশের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করে কেউ রেহাই পাবে না। তাহলে আর কেউ দেশের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করবে না। ‘এক ডাক এক গান, যুদ্ধাপরাধীর বিচার চান।’ যুদ্ধাপরাধীর বিচার হলে দেশে শান্তি ফিরে আসবে।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে আমার প্রাণের দাবি তারা দেশকে ভালবেসে দেশকে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়বে। নতুন প্রজন্ম জেনে রাখা উচিত আমরা স্বাধীন বাংলা গড়েছি। তাদের সোনার বাংলা গড়া উচিত।

অনুভূতি: সুলতান বেপারী, মুক্তিযোদ্ধা, বোয়ালিয়া, দুধখালী, মাদারীপুর।
অনুলিখন: মিলন মুন্সী, সম্পাদনায়: জহিরুল ইসলাম খান, রচনাকাল: ২০১০ইং।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top