You are here: Home / অনুভূতি / যুদ্ধের প্রতিটি দিনের কথা আজও মনে আছে

যুদ্ধের প্রতিটি দিনের কথা আজও মনে আছে

শওকত খলিফা:
১৯৭১ সালে আমি মিঠাপুর লক্ষ্মী নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীর ছাত্র। সংসারে অভাবের কারণে লেখাপড়া ছেড়ে সিলেটে ধান কাটতে যাই সেখানে থেকে শুনতে পাই দেশে যুদ্ধ লেগেছে। তাই ধান কাটা শেষ করে আমরা বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দেই। আমাদের নৌকা শিবচরের শেখপুর ঘাটে ভিড়াই। সকালে নাস্তা খাওয়ার সময় সেখান থেকে মিঠাপুরের দিকে ধোঁয়া ও বিকট শব্দ শুনতে পাই। আমি ও খলিল মুন্সী দৌড়ে দৌড়ে মিঠাপুরে আমাদের এলাকায় আসি। প্রথমে আমরা কানাই ডাক্তার বাড়ি যাই। দেখি লোকজন শূন্য বাড়ি-ঘর জ্বলছে। কিছু লোকজন লুট করছে।

এলাকার একটি লোককে টুপি মাথায় দিয়ে লুট করতে দেখি। যারা লুট করছিল তারা আমাদের ধাওয়া দেয়। আমি ও খলিল বাড়ি এসে কোন্তা নিয়ে ওদের ধাওয়া দেই। আমাদের বাড়িতে কেউ ছিল না। আমরা কাথা ভিজিয়ে আগুন নিভাই। আমরা যখন আসি তখন দুপুর। তারিখ ছিল ৫ জ্যৈষ্ঠ বৃহস্পতিবার। মিলিটারীরা যখন চলে গেল তখন একপা দুপা করে সামনে এগিয়ে আমার বাড়ির পশ্চিম দিকে দেখতে পাই, কয়েকটি লাশ পড়ে রয়েছে। হিন্দুপাড়ার দিকে যেতে যেতে দেখি লাশ আর লাশ। একটি বাগানের মধ্যে পড়ে রয়েছে এক সাথে ৭ থেকে ৮টি লাশ। এক মায়ের বুকের উপর শোয়া দেখলাম একটি শিশু। মা ও শিশু দুজন জড়াজড়ি অবস্থায় মরে রয়েছে।
সেদিন মিলিটারীরা মিঠাপুর থেকে কালিরবাজার পর্যন্ত গণহত্যা ও বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ করে। হিন্দু এলাকায় প্রতিটি বাড়িতে মানুষ হত্যা করেছিল। ওদের সামনে যে পড়েছে সেই মারা গেছে। আমার খালু আদারী বেপারী মিলিটারীর গুলিতে মারা যান। সেদিন শিশু ও বুড়োরা বেশি মারা গিয়েছিল। যারা বাড়ি ছেড়ে ঝোপ-জঙ্গলে পালিয়েছিল তাদের রেহাই হয়নি। কারণ এসব ঝোপ-জঙ্গল দেখিয়ে দেওয়ার জন্য বাঙ্গালী ছিল। সেদিন ছোবাহান চৌধুরী, লতিফ হাওলাদার, হাবিব মাষ্টার, মজিবর, রব খালাসীর মদদে মিলিটারীরা এই গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। মিলিটারী চলে যাওয়ার পর পালিয়ে যাওয়া লোকজন আসতে থাকে। লাশের মধ্যে থেকে স্বজনদের লাশ খুঁজে বের করে। কে বেঁচে আছে, কে মরে গেছে তা সেদিন কেউ বলতে পারেনি। স্বজনদের হারিয়ে সবাই আহাজারি করে। এলাকায় তখন ভয়াবহ পরিস্থিতি। পাড়ায় পাড়ায় তখন বহু লাশ। যারা জীবিত ছিল তারা ছিল নির্ভীক। লাশগুলোকে একসাথে করে ১৭ থেকে ১৮ জনকে গুপি ঠাকুরের বেতঝাড়ে মাটি চাপা দেয়া হয়। মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়ে যায়। কেউ বুঝে উঠতে পারিনি কেন এই হত্যাকান্ড হল। সবার মনে প্রশ্ন পাক সেনারা এত নিষ্ঠুর। তখন থেকে সবাই সর্তকতার সাথে থাকতে লাগল।
ওই আক্রমণের কিছুদিন পর ভোর রাতে মা ঘুম থেকে ডেকে উঠিয়ে বলে, মিলিটারি আইছে। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে বাড়ির সামনে এসে দেখি লোকজন ছোটাছুটি করছে। শীলবাড়ির থেকে কয়েকজন লোক আমার দিকে আসে। আমি তাদের থামতে বলি। কিছুক্ষণ পর দেখি মিলিটারী খুব কাছে এসে পড়েছে। আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে নকুল সাহার বাড়ির পেছনে জঙ্গলে পালালাম। আমার সাথে ছিল ললিত কর্মকারের মেয়ে বাসন্তী। ওখানে বসেই গুলির শব্দ শুনতে পাই। মিলিটারী চলে গেলে আমরা শিকদার বাড়ি (বর্তমান জমাদ্দার বাড়ি) আসি। এসে দেখি একটি রুমের মধ্যে ১৮টি লাশ পড়ে রয়েছে। রুমের ভেতর রক্ত। ওখানে নিতাই ঠাকুর পিঠে ও হাতে বেয়নেটের আঘাত খেয়েও বেঁচে থাকে। বাকি ১৭ জনকে একসাথে মাটি চাপা দেয়া হয়। তাদের যেখানে মাটি চাপা দেয়া হয় সেখানে বর্তমানে কৃষি ব্যাংক কালিরবাজার শাখা অবস্থিত।
একপর এক হানা দিয়ে হত্যা করায় আমরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গেলাম। ভাবতে লাগলাম এভাবে চলতে থাকলে জীবন বাচানো যাবে না। যুদ্ধে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলাম। এর মধ্যে বিমানবাহিনীতে চাকরীরত নূর ইসলাম ও রইসউদ্দিন ভাই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসে। তারা খোঁজ করতে থাকে কারা যুদ্ধে যাবে। ১৮ জনের একটি দল তৈরি হয়ে যায়। দিন তারিখ ঠিক করলাম। যাওয়ার দিন মাকে বলি আমি ভাবি বাড়ি যাই। সেখানে থেকে যাওয়ার সময় মায়ের উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখি। চিঠিতে মাকে জানাই আমার জন্য কান্নাকাটি করলে ওরা বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিবে। পথের খরচ জোগাতে ভাবির কানের স্বর্ণের দুল নিয়ে রওনা হই।
এক সপ্তাহ পর আমরা এক রাতের বেলা ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হই। আমাদের দলে ছিল শহীদ রইসউদ্দিন, নুর ইসলাম, খলিল মুন্সী, মোশারেফ বেপারী, ইয়াছিন, জহির মিয়া, রফিক, এসকান্দার হাওলাদার, জালাল ও ধূরাইলের কয়েকজন।
ট্রেনিং শেষ করে যশোর আসি। যশোরের এক যুদ্ধে রইসউদ্দিন ভাই শহীদ হয়। তাকে সেখানে কবর দেই। যুদ্ধ দিনের ঘটনা অনেক। যুদ্ধের প্রতিটি দিনের কথা আজও মনে আছে।
স্বাধীনতার এত বছর পরও মুক্তিযোদ্ধার কৃতিত্বের সম্মান অনেকে দেয় না। মুক্তিযোদ্ধারা খেয়ে না খেয়ে জীবন বাজি রেখে এনেছে এই স্বাধীনতা। তাদের কষ্টের ফল এখনো বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মুক্তিযোদ্ধারা আজ অভাবে দিন কাটাচ্ছে। কেউ রিক্সা চালাচ্ছে, কেউ অসুস্থ অবস্থায় বিছানে পড়ে রয়েছে। তাদের দেখার কেউ নেই।
আমি বহু মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে দেখেছি যারা দারিদ্র্য সীমার নিচে জীবনযাপন করছে। কোনো সরকারই তাদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে পারেনি। পত্র-পত্রিকায় যখন দেখি মুক্তিযোদ্ধারা সার্টিফিকেট হাতে ভিক্ষা করছে, তখন হৃদয়টা ভেঙ্গে যায়।

অনুভূতি: শওকত খলিফা, মুক্তিযোদ্ধা, উত্তর দুধখালী, মাদারীপুর।
অনুলিখন: মিলন মুন্সী, সম্পাদনায়: জহিরুল ইসলাম খান, রচনাকাল: ২০১১ইং।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top