You are here: Home / অনুভূতি / দেশের আর কোন ক্ষতি হতে দেব না

দেশের আর কোন ক্ষতি হতে দেব না

কাজী খলিলুর রহমান:
১৯৭১ সালে আমার বয়স ১৫ থেকে ১৬ বছর। এই বয়স পর্যন্ত লেখাপড়া করতাম না, বাবাকে চাষাবাদে সাহায্য করতাম। দেশে যুদ্ধ লেগেছে সে কথা জানতাম। পাকবাহিনী বিভিন্ন এলাকা আক্রমন করছে সে কথা জানতাম। ৫ জৈষ্ঠ্য পাকসেনারা আক্রমন করে মাদারীপুরের উত্তর দুধখালীর হিন্দু এলাকায়। আক্রমণে প্রাণ হারায় শতাধিক মানুষ। পাকদের আক্রমণে সাহায্য করে কিছু স্বার্থলোভী বিশ্বাস ঘাতক বাঙালিরা রাজাকাররা। পাক বাহিনীর সমর্থকারীরা পাকদের সাহায্য করার জন্য একটি সংগঠন তৈরি করেন। এ সংগঠনের নাম পিস কমিটি। এই পিস কমিটির কাজ ছিল পাকদের হিন্দু বাড়ি দেখিয়ে দেয়া, আক্রমণকৃত বাড়ির সম্পদ লুটপাট করা। মুক্তিবাহিনীর অবস্থান দেখিয়ে দেওয়া। তৎকালীন পিস কমিটির সদস্যরা আড়াল থেকে শিকদার বাড়ি আক্রমণ করতে পাকসেনাদের সাহায্য করে।
শিকদার বাড়ি তখন ফরিদপুর জেলার মধ্য অন্যতম ছিল। বাড়িটা এমন সুর্দশন ছিল যে সবাই একে রাজপ্রাসাদ বলতো। বাড়িতে ১৬টি বেশি পাকা দালান ছিল। প্রতিটি দালান দুই ও তিন তলাবিশিষ্ট ছিল। যার কিছু নিদর্শন আজও রয়েছে। বাড়িতে প্রায় শতাধিক লোকের বসবাস ছিল। সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করছিল। হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড়ের মত শান্তপ্রিয় মানুষের উপর ঝাপিয়ে পড়ে পাকবাহিনী। আক্রমণের খবর শুনে হিন্দুপাড়ার লোকেরা হতভম্ব হয়ে পড়ল। সবাই চারিদিক ছুটতে লাগল। তারপরেও চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা ৭০ জন পাক হানাদারের আক্রমণে সেদিন প্রাণ হারায় প্রায় ৮৫ বাঙালি। জ্বালিয়ে দেয় তাদের ঘরবাড়ি। আক্রমণের শব্দ শুনে আমরা অনেক দূরে পালিয়ে যাই। আক্রমণ শেষে সন্ধ্যার দিকে হিন্দুপাড়ায় এসে লাশ আর লাশ দেখি। মানুষ জীবন বাচানোর জন্য বাড়িতে, জমিতে জঙ্গলে যে যেখানে পালিয়ে ছিল সবাই লাশ হয়ে যায়। এক জায়গায় ৭টি লাশ একত্রে দেখি। লাশগুলো দেখে আমি স্থির থাকতে পারলাম না। ভাবতে লাগলাম যে, মানুষ মানুষকে এভাবে মারতে পারে। এভাবে আমাদের দেশের মানুষকে নির্বিচারে মেরে ফেললে, আমরা ওদের গোলাম হয়ে যাব। আমার মনে সাহস জাগল মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করার।
আমি খোঁজ করতে থাকি কারা মুক্তিযুদ্ধে যাবে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে আমরা গোপনে একটি দল তৈরি করে ফেলি। আমি যুদ্ধে যাব সে কথা বাড়ির কেউ জানতেন না। এক দিন রাতে কাউকে না বলে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দুধখালী ইউনিয়ানের চন্ডিবর্দী গ্রামের মোকলেস বেপারীর বাড়িতে জমা হই। সেদিন ছিল আলাউদ্দিন মাতুব্বর, মালেক মোল্লা, সাহাবদ্দিন হাওলাদার, গনেশ ঘোষ, মোশারেফ মোল্লা, বাচ্চু খলিফা, শাজাহান চৌকিদার, মোকলেস বেপারী ও তালেব হাওলাদার। এদের মধ্যে সবার ছোট ছিলাম আমি। সেদিন আমরা কিভাবে ভারতে যাব তা নিয়ে আলোচনা করলাম। সেদিন রাত ১০টার দিকে আমরা ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
যুদ্ধে যাওয়ার কারণ ছিল পাকদের অত্যাচার বন্ধ করে দাতভাঙ্গা জবাব দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা। যুদ্ধে জীবন বিপন্ন হয়, এ কথা জানতাম, কিন্তু ওদের নির্মম অত্যাচারে জীবনের মায়া শেষ হয়ে যায়। জীবনকে বাঁচানোর জন্য আমরা যুদ্ধ করি। ভারতে পৌছানোও তখন নিরাপদ ছিল না। পাকবাহিনীর সামনে পড়লে নির্ঘাত মৃত্যু। ৫ দিন পর আমরা যশোরে পৌছাই। পথিমধ্যে ভিক্ষা করে খাবার সংগ্রহ করে খাই। যশোর থেকে কিভাবে ভারতে যাব তার পথ খুজতে থাকি। সেই দিন রাতে আমরা এক নিহারু বাড়ি রাত্রিযাপন করি। তারা আমাদের রাতের খাবার খাইয়ে রাতভর পাহারা দেন। ফজরের আজানের সময় ঘুম থেকে উঠিয়ে ভারতে যাওয়ার পথ ধরিয়ে দেন। সূর্যের আলো চারদিক ছড়িয়ে পড়ার আগেই আমরা কপোতাক্ষ নদীর পাড়ে আসি। নদী পাড় হওয়ার নৌকা ছিল ওপার। আমি নদী সাতরিয়ে নৌকা এপার এনে পাড় হই। ভারতে যাবার সহজ পথ ছিল ট্রেনযোগে। কিন্তু যশোরের ট্রেন স্টেশন ছিল সম্পূর্ণ পাকবাহিনীর হাতে। তাই সে পথে না গিয়ে আমরা জঙ্গলের পথে হাটতে শুরু করলাম। অবশেষে আমরা চাঁদপাড়া ক্যাম্পে পৌছাই।
চাঁদপাড়া ক্যাম্পে আমাদের সাথে মতি উকিলের দেখা হয়। তিনি মাদারীপুর থেকে মুক্তিযোদ্ধা এনে ভারতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতেন। তিনি আমাদের বললেন মাতৃভূমির টানে তোমরা যুদ্ধে এসেছ ভাল কথা। যুদ্ধ করা সহজ কাজ নয়, প্রথমে তোমাদের জীবনের ঝুকি নিয়ে অনেক কষ্ট-ত্যাগ শিকার করতে হবে। বিনিময় তোমরা কিছুই পাবে না। আমরা বললাম, বিনিময় চাই লাল সবুজের পতাকা অর্থাৎ শোষণের হাত থেকে মুক্তি। এই মুক্তির জন্য আমরা সব কিছুই করতে পারি। চাঁদপাড়া ক্যাম্পে আমাদের ২৪ দিন বাঁশের লাঠির সাহায্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখান থেকে উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য বীরভূম পাঠানো হয়।
মেজর জলিলের নেতৃত্বে ১২০০ জনকে ট্রেন যোগে সেখানে পাঠানো হয়। হাজারো দামাল ছেলেরা প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য আসে। আমরা যেদিন সেখানে পৌছাই, সেদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ক্যাম্পটি উদ্বোধন করেন। তিনি উদ্বোধনের ভাষণে বাঙালি দামাল ছেলেদের প্রসংশা করে বলেন, তোমরা এত ছোট ছোট ছেলেরা দেশকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধে এসেছো, তার জন্য আমি খুব খুশি। কথাগুলো ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলেছিলেন। তিনি অভয় দিয়ে বলেন, তোমরা তোমাদের কাজ চালিয়ে যাও। ভারত সরকার তোমাদের সহযোগিতা করে যাবে। তোমাদের দেশ নিশ্চয়ই শত্রুমুক্ত হবে। তার ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে ট্রেনিংএর জন্য প্রস্তুত হয়ে যাই। সেনাবাহিনীরা আমাদের নাম নিবন্ধন করে মেডিকেল করে। আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দেওয়া হয়। আমাদের প্রশিক্ষণ শুরু হত ভোর ৪টায়। দেশ-বিদেশের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। অস্ত্রের মধ্যে ছিল থ্রি নট থ্রি, এসএলআর, এসএমজি, এলএমজি, চায়না, ব্রিটিশিয়ান, রাশিয়ান হেবি মেশিনগান, মর্র্টার, টুইঞ্চ, থ্রিইঞ্চ, কামান, ছোট থাট্রি সিক্স হ্যান্ড গ্রেনেড, ছোট বোমা, বড়বোমা ও বিভিন্ন ধরনের ডিনামাইড।
প্রতিদিন সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাদের প্রশিক্ষণ দিত। অল্পদিনের মধ্যেই আমি সব অস্ত্র সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করি। যুদ্ধের প্রশিক্ষণের কষ্টের কথা মনে হলে আজও চোখে পানি এসে যায়। মাতৃভূমির টানে অসহ্য কষ্ট করেছি। এক মাস প্রশিক্ষণের পর আমাদের কোলকাতায় রেস্টহাউজে পাঠানো হয়। প্রশিক্ষণের ক্লান্তি দূর করার জন্য এখানে আমাদের রেস্টে দেওয়া হত। সেখান থেকে আমাদের দেশে পাঠানো হয়। প্রত্যেককে দেওয়া হয় একটি মেশিন গান, একশত রাউন্ড গুলি, হ্যান্ডবোমা এবং ৫০ টাকা।
দেশে ফিরে আসতে হবে। শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। দুই মাস পর দেশে ফিরেছি বাড়ির খোঁজ কিছুই জানতাম না। বাড়িতে কি সবাই বেঁচে আছে? এ প্রশ্ন বারে বারে মনে জাগতো। দেশে ফিরে আগে মাকে দেখবো না যুদ্ধে যাব এই চিন্তা করতাম। দেশে ফেরার পথে টেকারহাটে পাকবাহিনীর সাথে আমাদের প্রথম লড়াই হয়। আমাদের কোন ক্ষয়-ক্ষতি হয় নি। সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে আসি। বাড়ির সবাই আমাকে দেখে অবাক হয়। তারা ভেবেছিল আমি মারা গেছি। মা আমাকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলেন।
দেশে এসে দেশের অবস্থা সর্ম্পকে জানলাম। প্রথমে দেশের রাজাকারদের হত্যা করতে আরম্ভ করলাম। আমরা মাদারীপুরের কুলপদ্মী, টেকেরহাট ও সমাদ্দর থেকে পাকবাহিনীদের বিতাড়িত করি। টেকেরহাট আক্রমণ করার সময় আমি দল থেকে বিছিন্ন হয়ে যাই। বাড়িতে ফেরার পথ হারিয়ে ফেলি। আমার দলের সবাই আগে বাড়ি ফিরে এসে খবর দেয় আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ির সবাই কান্নাকাটি শুরু করে। সমাদ্দারে দুই দিন যুদ্ধের পর পাকবাহিনী আত্মসমর্পন করে। সেদিন ছিল ১০ ডিসেম্বর। মাদারীপুর স্বাধীন হয় ১০ ডিসেম্বর। বিজয়ের আনন্দে আমরা লাল সবুজের পতাকা উড়াই। আমাদের কষ্টে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। অপেক্ষায় থাকি স্বাধীন বাংলাদেশ পাওয়ার। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর বাংলার বুকে ওড়ে স্বাধীনতার পতাকা। স্বাধীন বাংলাদেশ, স্বাধীন বাংলাদেশ।
আজ ৩৯ বছর শেষে আমাদের কষ্টে অর্জিত বাংলাদেশে স্বাধীনতা বিরোধীরা দেশকে ধ্বংস করে দেশে বসবাস করছে। আমরা এসব চিরশত্রু দ্বারা দেশের আর কোন ক্ষতি হতে দেব না। যুদ্ধে অপরাধীর বিচার না হলে মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরব থাকবে না। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি যুদ্ধাপরাধীর বিচার করে মুক্তিযোদ্ধাদের কৃতিত্ব রক্ষা করুন।
বর্তমান প্রজন্ম জানে না মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। মুক্তিযোদ্ধাদের উচিত বর্তমান প্রজন্মকে যুদ্ধের ইতিহাস জানানো। বর্তমান প্রজন্মের কাছে আমার দাবি এই কষ্টের বাংলাকে অপশক্তি দ্বারা ক্ষতি হতে দিবেন না। মাকে ভালোবাসার মত দেশকে ভালোবাসতে হবে। বিদেশী সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলার সংস্কৃতিকে ধ্বংস যাতে না হয়।

অনুলিখন: মিলন মুন্সী, সম্পাদনায়: জহিরুল ইসলাম খান। রচনাকাল: ২০১০ইং।
অনুভূতি: কাজী খলিলুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার, মিঠাপুর, মাদারীপুর।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top