You are here: Home / অনুভূতি / চিৎকার করে ডাকতে ইচ্ছে করে মা

চিৎকার করে ডাকতে ইচ্ছে করে মা

Shariful Hasan

শরিফুল হাসান: আবার সেই ৩ ডিসেম্বর। আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের দিন। ২০০৮ সালের এই দিন ভোরে আমি আমার মাকে হারিয়েছি। জীবনে যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন প্রতি বছরের ৩ ডিসেম্বর আমার জীবনের শোকের দিন হয়ে থাকবে। আমার এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় আমার মা নেই। মনে হয়, ঢাকা ছেড়ে বাসায় গেলেই বোধহয় মা ছুটে আসবে। ব্যস্ত হয়ে পড়বে আমাকে নিয়ে। মানতে ইচ্ছে করে না, বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না। তবুও এটাই সত্যি যে এমনটি আর হবে না আমার এ জীবনে। আর কখনই আমার মা আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে না। কি দূরন্ত উচ্ছল জীবনই না ছিল আমার। এই একটি ঘটনা আমাকে কত বদলে দিয়েছে। মাকে হারিয়ে আমি যেন হঠাৎ বড় হয়ে গেছি।

২০০৮ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তায়, কোরবানির ঈদের কয়েকদিন আগে আমরা মাকে হাসপাতালে ভর্তি করি। সুস্থ্য একজন মানুষ, সামান্য একটি সমস্যার কারণে হাসপাতালে। আমরা কেউই বুঝতেই পারিনি এভাবে হুট করে মা আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। হাসপাতালে তিনদিন সবই ভালো। কিন্তু ১ ডিসেম্বর কিছু বুঝে উঠার আগেই হঠাৎ আইসিইউতে নিতে হয়। দুদিন সেন্ট্রাল হাসপাতালের আইসিইউতে থাকার পর আমার মা চলে গেলেন আমাদের চোখের জলে ভাসিয়ে, মাত্র ৪৫ বছর।

আমার মা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ তার হয়নি বিয়ের কারণে। মায়ের সহপাঠীরা আমাদের বলতেন, তোরা লেখাপড়ায় ভালো, কারণ তোর মা ক্লাসের সেরা ছাত্রী ছিলেন। মায়ের মনটা ছিল বিশাল। চট্টগ্রামে আমার বাবার সরকারী চাকুরি। সরকারী কলোনীতে আমরা যে বাসায় থাকতাম সেখানে একবার যে গেছে সে মায়ের রান্না খেয়ে, তার আন্তরিকতা দেখে ভক্ত হয়ে গেছে। মা মানুষকে খাইয়ে খুব আনন্দ পেতেন। সবসময় তিনি বাসায় অনেক লোকজন, উৎসব দেখতে পছন্দ করতেন। আমরা দিন নেই, রাত নেই বাসায় বন্ধুবান্ধব নিয়ে যেতাম। মা কখনো বিরক্ত হয়ে বলতেন না অসময়ে কেন এতো বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসিস? এমন অসাম্প্রদায়িক মানুষ, উচ্চ মনের মানুষ আমি কম দেখেছি।

মা কখনো গরীব বা ভিক্ষুকদের না বলতেন না। কলোনীতে থাকার কারণেই বাসায় সব সময় ভিক্ষুক আসতো। আমরা খুব বিরক্ত হতাম। কিন্তু মা হাসিমুখে কিছু না কিছু দিয়ে তাদের বিদায় করতেন। তাঁর জীবনে এমন দিন খুব কমই গেছে যেদিন তিনি কোন গরীব বা ভিক্ষুককে খাওয়ান নি। মানুষের জন্য তাঁর ছিল অসম্ভব সহমর্মিতা। কারো কোন কষ্টের কথা শুনলেই মা কাঁদতেন। তাদের স্বান্ত্বনা দিতেন।

মা মারা যাওয়ার পর আমার ছোট বোন জানালো, কয়েকদিন আগে নাকি সকাল ১১টার দিকে এক ভিক্ষুক আমাদের বাসায় এসে মাকে বললো তার খুব খিদে লেগেছে। ১১টার সময় রান্না থাকার কথা নয়, তাই বাসায় ভাত নেই। কিন্তু আমার মা গরম ভাত রান্না করে তাকে খাইয়ে বিদায় করলেন। এমন হাজারো ঘটনা আছে আমার মায়ের জীবনে। ছুটিতে বাসায় গেলেই মা আমার কাছে বলতেন হাসান টাকা দে তো। আমি বলতাম মা কি করবে? তিনি হাসতেন। সেই টাকা চলে যেতো গরীবদের কাছে। আমরা বাসায় আছি-ড্রয়িং রুমে টিভি দেখছি-হঠাৎ দেখি কোন এক ভিক্ষুক। আমরা তাকে বলি মাফ করো। সে বলে, তোমার মাকে ডাকো। তোমার মা আমাদের কখনো খালি হাতে বিদায় করে না। আমরা চুপসে যাই তখন। মাঝে মাঝে এ নিয়ে মায়ের সাথে ঝগড়াও বাঁধে। বলি মা ভিক্ষকু-গরীব এরা কি তোমার বান্ধবী? সব সময় এতো জ্বালাতন করে কেন? মা হাসে। প্রতিবেলা রান্নার আগে মা পুরনো ভাত বাইরে কাক বা শালিককে দিতেন। মায়ের রান্না করার সময় রান্নাঘরের.সামনে সব সময় পাখি থাকতো। মা প্রচুর বই পড়তেন। তাঁর কারণেই ছোটবেলা থেকে আমরা ভাই-বোন প্রচুর বই পড়তাম।

আমাদের পরিবারে দুঃখ কষ্ট সেভাবে ছিল না। বেশিরভাগ সময়েই ছিল আনন্দ উচ্ছ্বলতা। কিন্তু এত আনন্দের মধ্যেই আমার মা চলে গেলো আমাদের ছেড়ে। আমরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি সে এভাবে হঠাৎ করে চলে যাবে। ৩ ডিসেম্বর সকাল সোয়া সাতটায় আমার মা মারা যান। সেন্ট্রাল হাসপাতালে আমার ছোটবোনটার কান্না দেখে আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল কষ্টে।

আমরা দুই ভাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারণে ও-ই বাসায় বেশি থাকতো। ওর কত আফসোস মাকে নিয়ে। ও হাসপাতালে মাকে সুস্থ দেখে, রাতে খাইয়ে বাবার সাথে চট্টগ্রাম গিয়েছিল ভর্তি হতে। এসে দেখে মা আর নেই।
এসএসসি পাস করার পর বাসা ছেড়ে কলেজ হোস্টেল, এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যলেয়ের হল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পেশা আবার সাংবাদিকতা। তাই বছরের খুব কম সময় বাসায় গিয়ে থাকতে পারতাম। কিন্তু যখন যেতাম মা আমায় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠতেন। কি খাওয়াবেন কি করবেন দিশা পেতেন না। আমি ফেরার সময় মায়ের চোখ ছলছল করতো। ভাবতে কষ্ট হয়, সেসব দিন আর কখনো ফিরে আসবে না।
আমার খুব চিৎকার করে তোমাকে ডাকতে ইচ্ছে করে মা।

image001লেখক: শরিফুল হাসান, সাংবাদিক, দৈনিক প্রথম আলো।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top